রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘর থেকে ৭৪ জন গ্রাহকের ১ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর প্রতিষ্ঠানটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থায় চিড় ধরেছে। আতঙ্কে মেয়াদপূর্তির আগেই সঞ্চয়ের টাকা তুলে নিচ্ছেন অনেকে।
গত জুলাই থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত শতাধিক গ্রাহক কয়েক কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে প্রতিদিনই টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় প্রধান ডাকঘরে আসছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।
এদিকে গ্রাহকদের কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাসকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে কুষ্টিয়া প্রধান ডাকঘরের সহকারী পোস্টমাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
একই ঘটনায় আরো ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়া প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার আবুল কালাম আছাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত ৪ আগস্ট দক্ষিণাঞ্চল খুলনার পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদ স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বিকাশ চন্দ্রকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
অফিস আদেশে বলা হয়, জনস্বার্থে ও সরকারি কাজের স্বার্থে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের দায়ে একই বিধিমালার ১২ ধারা মোতাবেক বিকাশ চন্দ্রকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
খাস্তকালীন সময়ে তাকে নিয়মিত হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে হবে এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া সদর দপ্তর ত্যাগ করা যাবে না। এ সময় তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন।
যেভাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ
কয়েক মাস আগে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের ৭৪ জন গ্রাহকের ১ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। নতুন পোস্টমাস্টার মো. শামীম আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনেরা মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে টাকা জমা দিতে গেলে সাবেক পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাসসহ কয়েকজন কর্মকর্তা তাদের লেটার রাইটার শিহাব মৃধার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। পরে শিহাব ডাক বিভাগের সিলযুক্ত সাদা স্লিপের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করতেন। ডাক বিভাগের সিল থাকায় গ্রাহকেরা ওই স্লিপকে বৈধ জমার রসিদ মনে করেই টাকা জমা দেন।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তার বাড়িতেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না এবং মুঠোফোনও বন্ধ রয়েছে বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের দাবি, টাকা জমা দেওয়ার সময় তারা সরাসরি সাবেক পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাসের কাছে গেলে তিনি শিহাব মৃধার কাছে টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলতেন। তবে টাকা নেওয়ার সময় পোস্ট অফিসের পিয়ন রেজাউলকে তারা কখনো দেখেননি বলে দাবি করেন তারা।
এ ছাড়া পোস্টাল অপারেটর ও ট্রেজারির দায়িত্বে থাকা প্রণব কুমার সরকার এবং নাজমুলের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার পরও শিহাব মৃধার কাছে টাকা জমা দেওয়ার পরামর্শ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
‘মূল হোতা সাবেক পোস্টমাস্টার’
আত্মগোপনে থাকা লেটার রাইটার শিহাব মৃধা মুঠোফোনে বলেন, গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা সত্য। তবে এ ঘটনায় পোস্ট অফিসের সবাই জড়িত নন।
শিহাবের দাবি, ‘আমি টাকা নিয়ে সাবেক পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাসের কাছে রেখে দিতাম। তিনিই টাকা আত্মসাতের মূল হোতা।’
এ কাজে পোস্টাল অপারেটর নাজমুল ও ট্রেজারার প্রণব কুমার সরকার সহযোগী হিসেবে জড়িত ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সালিসে অঙ্গীকারনামার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টাকা উদ্ধারের জন্য গত ১৩ জুন রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে শিহাব মৃধার বৃদ্ধা মা শিউলি বেগমসহ কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বর্তমান পোস্টমাস্টার মো. শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া শামীম আহমেদের উপস্থিতিতে রাজবাড়ীর মূলঘর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে একটি সালিশ অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে। শালিশে উপস্থিত দুই জনপ্রতিনিধি ও কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, শুধু আত্মীয়তার কারণে রেজাউলসহ কয়েকজন কর্মচারীকে ঘটনায় জড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
সালিসে শিহাবের স্বজন ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বলা হয়, অভিযুক্ত চারজন গ্রাহকদের আত্মসাৎ করা অর্থ ফেরত দিতে সম্মত হয়েছেন।
আদালতে পৃথক দুই মামলা
এ ঘটনায় গত ৩০ জুলাই ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পক্ষ থেকে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে রাজবাড়ীর আদালতে মামলা করা হয়। আদালতের বিচারক মো. হায়দার আলী মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন।
এরপর গত ২ আগস্ট কুষ্টিয়া ডাক বিভাগের পোস্ট অফিস পরিদর্শক মো. শহিদুল ইসলাম সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আসামি করে বিশেষ জজ আদালতে আরেকটি মামলা করেন। বিচারক আনিসুর রহমান মামলাটি আমলে নিয়ে এজাহার হিসেবে গণ্য করে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশ দেন।
আস্থার সংকটে ডাকঘর
সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাহকের উপস্থিতি খুবই কম। অফিসের বেশ কয়েকটি চেয়ারও খালি ছিল। দ্বিতীয় তলায় নিজ কক্ষে অবস্থান করছিলেন পোস্টমাস্টার মো. শামীম আহমেদ।
তিনি বলেন, দুপুরের খাবারের সময় হওয়ায় ওই সময়ে গ্রাহকের উপস্থিতি কম ছিল। তবে প্রতারণার ঘটনায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব ডাকঘরের কার্যক্রমেও পড়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
শামীম আহমেদ বলেন, ‘অনেক গ্রাহক টাকা তুলে নেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। আবার অনেকে তাদের জমা করা টাকা ঠিকঠাক আছে কি না, তা যাচাই করতে ডাকঘরে আসছেন। তবে প্রধান ডাকঘরের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা অটুট রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
এদিকে, মেয়াদপূর্তির আগেই মেয়াদি হিসাবের টাকা উত্তোলনের একাধিক আবেদনপত্র এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এসব আবেদনে পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদের স্বাক্ষর রয়েছে।
নাবিবর বিবি নামের এক গ্রাহক পারিবারিক প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে মেয়াদপূর্তির আগেই টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে—এই ভয়ে টাকা তুলে নিয়ে আসছি। আমরা আর পোস্ট অফিসে টাকা রাখব না।’
পাংশা উপজেলার মাগুরাডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা বাবলুও তার এফডি-৯৩৬ হিসাবের টাকা মেয়াদপূর্তির আগেই উত্তোলনের আবেদন করেছেন। আবেদনে সাংসারিক প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা হলেও বাবলু বলেন, ‘সরকারি অফিস থেকে যদি গ্রাহকের টাকা গায়েব হয়ে যায়, তাহলে বিষয়টি দুঃখজনক। কত গরিব মানুষের টাকা মেরে দিয়েছে—সেই ভয়ে টাকা তুলে নিয়ে আসছি।’
