🏛️ সম্পাদকীয় মন্তব্য
সম্প্রতি বৃহত্তর ফরিদপুরের জেলাগুলোতে পুলিশ, র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তৎপরতায় বিপুল পরিমাণ গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবাসহ অসংখ্য চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হচ্ছে। তিন-চার মাস ধরে টানা ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ বা গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়ে, নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং ব্যক্তিগত শত্রুতা তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন একজন কুখ্যাত মাদক কারবারিকে আইনের আওতায় আনছে-তখন স্বস্তি ফিরছে জনমনে। কিন্তু এই স্বস্তি স্থায়ী হচ্ছে না। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মাসের পর মাস চেষ্টা চালিয়ে যে আসামিকে ধরা হচ্ছে, আদালতে প্রেরণের মাত্র সাত দিনের মাথায় সে জামিনে মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। জামিন পেয়েই তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একপ্রকার বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে আবারও দ্বিগুণ দাপটে নামছে পুরোনো কারবারে। এই সংস্কৃতি শুধু জননিরাপত্তাকেই হুমকিতে ফেলছে না, বরং মাঠপর্যায়ের সৎ ও ডেডিকেটেড পুলিশ বা র্যাব সদস্যদের চরমভাবে নিরাশ করছে।
প্রশ্ন উঠেছে, আইনের এই অপব্যবহার, বিচারসংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির কথিত স্বজনপ্রীতি এবং আইনি ব্যবস্থার এই ‘ইমব্যালেন্স’ বা ভারসাম্যহীনতা ভাঙার উপায় কী? মাদক কারবারিরা যাতে আদালত থেকে এত সহজে জামিন না পায়, সেজন্য দেশের প্রচলিত আইনে সুনির্দিষ্ট বিধান ও কঠোরতার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন কেবল এর সঠিক ও কঠোর প্রয়োগ।
মাদক অপরাধীদের সহজ জামিন রুখতে হলে দেশের ফৌজদারি কার্যবিধি (ঈৎচঈ) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সুনির্দিষ্ট ধারাগুলোর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৭ ধারা (জামিন অযোগ্যতা): এই আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে সংঘটিত প্রধান অপরাধগুলো সাধারণত জামিন অযোগ্য (ঘড়হ-নধরষধনষব)।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো অপরাধের শাস্তি যদি মৃত্যু বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়, তবে আসামিকে সাধারণত জামিন দেওয়া যাবে না-যদি না আদালত মনে করেন যে আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। মাদক কারবারিদের ক্ষেত্রে যেহেতু হাতেনাতে বা তল্লাশি চালিয়ে মাদক উদ্ধার করা হয়, তাই প্রথমদিকেই তাদের পক্ষে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ থাকে না। আদালতকে এই ধারার মূল স্পিরিট আমলে নিতে হবে।
অনেক সময় দুর্বল এজাহার বা ত্রুটিপূর্ণ প্রাথমিক প্রতিবেদনের সুযোগ নিয়ে আসামিপক্ষ দ্রুত জামিন পেয়ে যায়। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গ্রেপ্তারের পর থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারা মোতাবেক রিমান্ড বা রির্পোট পেশের সময় নিখুঁত তথ্য ও মাদকের রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট যুক্ত করতে হবে, যেন বিচারক জামিন মঞ্জুর করার কোনো আইনি ফাঁক না পান।
পরিশেষে,
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রক্তপানি করা পরিশ্রম ২/৩ দিনের একটি জামিন আদেশে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে-একটি সভ্য সমাজে তা মেনে নেওয়া যায় না। মাদক কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি একটি প্রজন্ম ও রাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দেওয়ার নীরব যুদ্ধ। তাই মাদক কারবারিদের জামিন পাওয়ার এই সহজ পথ চিরতরে বন্ধ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রপক্ষ (পিপি/জিপি) এবং তদন্তকারী সংস্থার মধ্যে এক ইস্পাতকঠিন সমন্বয়। বিচার বিভাগের কোনো পর্যায়ে যদি ‘স্বজনপ্রীতি’ বা ‘আইনি ভারসাম্যহীনতা’র সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে উচ্চ আদালতের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে তা দূর করতে হবে। একই সাথে, জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে অপরাধীর পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড (ঈৎরসরহধষ অহঃবপবফবহঃং) কঠোরভাবে যাচাই করা আদালতের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।
আইনের উদ্দেশ্য অপরাধীকে পুনর্বাসন করা হতে পারে, কিন্তু মাদকের মতো দেশবিনাশী অপরাধের গডফাদারদের আইনি ফাঁকফোকরে মুক্ত বিচরণ করতে দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। রাষ্ট্রকে এখনই এই ‘জামিন সংস্কৃতির’ লাগাম টানতে হবে; অন্যথায় মাঠপর্যায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়বে, যা সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তাকে এক ভয়ানক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
