【 মাহ্ফুজা আক্তার 】
১৯৭৭ সালের ১লা এপ্রিল। সকালবেলা কফির কাপে চুমুক দিয়ে ব্রিটিশ পাঠকরা যখন মর্যাদাপূর্ণ পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’ হাতে নিলেন, তারা দেখলেন ভেতরে সাত পৃষ্ঠার একটি বিশাল বিশেষ সাপ্লিমেন্ট। বিষয়বস্তু? ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত এক চমৎকার দ্বীপরাষ্ট্র— ‘সান সেরিফ’ (San Serriffe)। এর নীল জলরাশি, সমৃদ্ধ অর্থনীতি আর অদ্ভুত সব সংস্কৃতি দেখে পাঠকরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়লেন। কিন্তু দিনশেষে এটি ছিল সাংবাদিকতার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা রসিকতা বা ‘এপ্রিল ফুল’। আজ দৈনিক কুমারের পাতায় আমরা ফিরে দেখব সেই ঐতিহাসিক ধাপ্পাবাজির নেপথ্য কাহিনী।
রহস্যময় সেই দ্বীপের মানচিত্র
দ্য গার্ডিয়ানের সেই সাপ্লিমেন্টে সান সেরিফকে একটি ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, যা দেখতে অনেকটা সেমিকোলন (;) এর মতো। এর দুটি প্রধান দ্বীপ ছিল:
আপার ক্যাস (Upper Caiss)
লোয়ার ক্যাস (Lower Caisse)
আপনি যদি মুদ্রণ বা টাইপোগ্রাফির সাথে পরিচিত হন, তবে এই নামগুলো শুনেই আপনার খটকা লাগার কথা। কারণ মুদ্রণ শিল্পে বড় হাতের অক্ষরকে বলা হয় ‘আপার কেস’ এবং ছোট হাতের অক্ষরকে ‘লোয়ার কেস’। এমনকি দেশটির নাম ‘সান সেরিফ’ নিজেই ফন্টের একটি ধরণ (Sans-serif)। কিন্তু গার্ডিয়ানের নিখুঁত বর্ণনা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে, সাধারণ মানুষ এসব সূক্ষ্ম সংকেত ধরতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন।
তথ্যচিত্রের মায়াজাল: কী ছিল সেই সাপ্লিমেন্টে?
গার্ডিয়ান কোনো কার্পণ্য করেনি। তারা এই কাল্পনিক রাষ্ট্রের ইতিহাস, ভূগোল এবং অর্থনীতি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিল।
রাজধানী: দেশটির রাজধানীর নাম ছিল বোদোনি (Bodoni), যা আসলে একটি বিখ্যাত ফন্টের নাম।
নেতৃত্ব: দ্বীপটির রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন জেনারেল এমজেড পিকা (M.J. Pica)। এখানে ‘চরপধ’ হলো টাইপোগ্রাফিতে পরিমাপের একটি একক।
মুদ্রা: তাদের নিজস্ব মুদ্রা ছিল, যার নাম দেওয়া হয়েছিল স্পেরো (Spero)।
সংস্কৃতি: জানানো হয়েছিল যে সেখানকার মানুষ অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ এবং তাদের প্রধান ভাষা হলো ‘কিউয়ার্টি’ (QWERTY)-যা মূলত আমাদের কম্পিউটারের কীবোর্ডের প্রথম ছয়টি অক্ষর!
পাঠকদের প্রতিক্রিয়া: যখন হাহাকার পড়ে গেল
সাপ্লিমেন্টটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গার্ডিয়ান দপ্তরে ফোনের বন্যা বয়ে যায়। শত শত পাঠক জানতে চান, এই স্বর্গে যাওয়ার উপায় কী? ট্রাভেল এজেন্সিগুলোতে ফোন করে মানুষ জিজ্ঞেস করতে শুরু করে, “সান সেরিফের টিকিট কত?” এমনকি নামী-দামী এয়ারলাইনসগুলোও বিড়ম্বনায় পড়ে যায়, কারণ তাদের কাছে এই রুটের কোনো ম্যাপ নেই।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল বিজ্ঞাপনের অংশটি। কোডাক বা গিনেসের মতো বড় বড় কোম্পানিগুলোও এই রসিকতায় যোগ দিয়েছিল। কোডাক একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছিল, “আপনি যদি সান সেরিফে যান, তবে আমাদের বিশেষ ফিল্ম নিয়ে যান যা দ্বীপের তীব্র আলোতে ছবি তুলতে সক্ষম।” মানুষ এগুলোকেও ধ্রুব সত্য বলে ধরে নিয়েছিল।
কেন এই প্রতারণা এত সফল হয়েছিল?
প্রশ্ন জাগতে পারে, মানুষ কেন এত সহজে বিশ্বাস করল? এর পেছনে তিনটি বড় কারণ ছিল:
গার্ডিয়ানের বিশ্বাসযোগ্যতা: গার্ডিয়ান তখন (এবং এখনো) একটি অত্যন্ত গম্ভীর ও বস্তুনিষ্ঠ পত্রিকা। তারা এমন ফাজলামি করতে পারে, তা পাঠকদের কল্পনার বাইরে ছিল।
নিখুঁত ডিটেইলিং: সাত পৃষ্ঠার সেই ফিচারে গ্রাফ, চার্ট, মানচিত্র এবং ফটোশপ করা (তৎকালীন এনালগ পদ্ধতিতে) ছবি ছিল। প্রতিটি তথ্য একে অপরের সাথে মিলে যাচ্ছিল।
সাধারণ মানুষের ভ্রমণের নেশা: সত্তরের দশকে ইউরোপীয়দের মধ্যে নতুন নতুন দ্বীপ আবিষ্কার করে সেখানে ছুটি কাটানোর একটি প্রবণতা ছিল। সান সেরিফ যেন তাদের সেই আকাঙ্ক্ষাকে উসকে দিয়েছিল।
এপ্রিল ফুল থেকে লোকগাথা
বিকেলের দিকে যখন চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল, তখন গার্ডিয়ান কর্তৃপক্ষ মৃদু হেসে স্বীকার করল যে এটি ছিল নিছক একটি কৌতুক। কিন্তু ততক্ষণে সান সেরিফ অমর হয়ে গেছে। আজও সাংবাদিকতার ক্লাসে ‘সান সেরিফ’ পড়ানো হয় এটি বোঝাতে যে, মিডিয়া কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
পরবর্তী বছরগুলোতেও মানুষ ভুলতে পারেনি এই দ্বীপের কথা। এমনকি অনেক মানুষ দাবি করতে শুরু করেন যে তারা আসলে সান সেরিফে গেছেন! মানুষের কল্পনাশক্তি যে কতদূর যেতে পারে, এটি তার এক অনন্য উদাহরণ।
১৯৭৭ সালের সেই ১লা এপ্রিল আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে যে, তথ্যের সত্যতা যাচাই করা কতটা জরুরি। আজ ইন্টারনেটের যুগে আমরা ফেক নিউজ নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু প্রায় ৫০ বছর আগে একটি ছাপানো কাগজ দেখিয়ে দিয়েছিল যে সৃজনশীলতা আর রসিকতা মিশিয়ে দিলে আস্ত একটা দেশও বানিয়ে ফেলা সম্ভব।
পরের বার যখন কোনো ফন্ট সিলেক্ট করবেন বা কীবোর্ডে টাইপ করবেন, একবার ভাববেন ‘সান সেরিফ’ বা ‘কিউয়ার্টি’র কথা। কে জানে, হয়তো কোনো এক সমান্তরাল মহাবিশ্বে আজও জেনারেল পিকা তার বোদোনি শহরে বসে কোনো এক ব্রিটিশ পর্যটকের সাথে কফি খাচ্ছেন!
তথ্যসূত্র:
দ্য গার্ডিয়ান আর্কাইভস, ১৯৭৭।
অনুলিখন-
নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক কুমার।
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
