হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর
রাত তখন প্রায় আটটা। ফরিদপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে মানুষের ভিড় ধীরে ধীরে কমছে। ট্রেনের হুইসেল আর যাত্রীদের কোলাহলের মাঝেই বারবার ভেসে আসছে একটি চড়া অথচ কোমল কণ্ঠ— “এই বাদাম, এই বাদাম… দিবো বাদাম!”
ডাকটি যার, তার নাম হামিম। বয়স মাত্র পাঁচ বছর। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা রঙিন বই-খাতা, স্কুলব্যাগ কিংবা খেলনা; সেই বয়সে হামিমের মাথায় উঠেছে বাদামের ভারী ট্রে, কাঁধে চেপেছে পুরো সংসারের দায়িত্ব।
হামিম ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার চরযশোরদী ইউনিয়নের নিকোরহাঁটি গ্রামের সন্তান। বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে ভাঙ্গা উপজেলার আলগী এলাকায় ভূমি অফিসের পাশের একটি ভাড়া বাসায় থাকে সে। জীবনের নির্মম বাস্তবতা তাকে খুব অল্প বয়সেই ‘বড়’ করে তুলেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, হামিমের বাবা সুমন দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি যখন বিছানায় শয্যাশায়ী, তখন বাধ্য হয়েই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে এই ছোট্ট শিশুকে। প্রতিদিন বাদাম আর বুটভাজার ট্রে মাথায় নিয়ে ফরিদপুরের বিভিন্ন রেলস্টেশন ও ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়ায় সে। যাত্রীদের কাছে ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করে যে সামান্য টাকা আয় হয়, তা-ই এখন পরিবারের একমাত্র ভরসা। এই টাকা দিয়েই চলে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ আর বাবার ওষুধ কেনা।
“হামিম জানে না খেলাধুলার আনন্দ কী, চেনে না স্কুলের বেঞ্চে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার সুখ। সে শুধু জানে—তাকে বিক্রি করতে হবে, আয় করতে হবে। কারণ বাড়িতে অপেক্ষা করছেন অসুস্থ বাবা আর অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করা মা।”
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হামিমকে দেখলে মনে হয়, ক্লান্তি শব্দটার সঙ্গেই তার কোনো পরিচয় নেই। মাথার ওপর বড় ট্রে, মুখে অবিরাম ডাক, আর চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। কিন্তু সেই দৃঢ় চোখের আড়ালেই লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া এক শৈশবের করুণ গল্প।
আমাদের সমাজে হামিমের মতো হাজারো শিশু প্রতিদিন নীরবে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তাদের প্রয়োজন কেবল সাময়িক সহানুভূতি নয়, বরং শিক্ষা, নিরাপত্তা ও একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা এবং সামান্য আর্থিক সহায়তা পেলে হামিমকে আর এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়াতে হতো না। তার ছোট্ট হাতে আবারও ফিরে আসতে পারত খাতা-কলম আর রঙিন বই।
সমাজ সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু তার পরিবারের নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও। হামিমের মতো শিশুদের সুরক্ষায় বিত্তবান ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে এগিয়ে আসা জরুরি।
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বাদাম বিক্রি করা হামিমের চোখেও আছে সুন্দর জীবনের আশা। সেই আশার আলো নিভে যাওয়ার আগেই প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ; যাতে একদিন সব সংকট পেরিয়ে হামিম গর্ব করে বলতে পারে— “আমি আমার স্বপ্ন জয় করেছি।”
