আলমগীর জয়

সময় পরিবর্তনশীল। আর সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সব কিছুই ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন হচ্ছে। শুধু পরিবর্তন নয়,হচ্ছে বিবর্তন-রূপান্তরসহ আরও কত কিছু। তবে পরিবর্তন-বিবর্তন-রূপান্তরের ঘর্ষণে হারিয়েও যাচ্ছে অনেক কিছু। এসবের মধ্যে রয়েছে যেমন নানাবিধ বস্তুগত উপাদান, আবার অবস্তুগত উপাদানও কম নয়। এরই মাঝে অন্যতম একটি বিষয় আঞ্চলিক শব্দ। আধুনিক বাংলা, শুদ্ধ বাংলা বা প্রমিত বাংলা—যে বিষয়ের কথাই বলি না কেন, আঞ্চলিক শব্দ সব ভাষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐতিহ্য, ব্যবহার, উৎকর্ষতা সর্বোপরি একটি ভাষাকে বৈচিত্র্যময় ও জীবন্ত করে তুলতে এর গুরুত্ব কম নয়। যাহোক, এ বিষয়ে অভিজ্ঞরা বিস্তারিত বলতে পারবেন; আমি মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

আমরা গৃহপালিত পাখি হিসেবে মোরগ বা মুরগিকে চিনে থাকি এবং সংশ্লিষ্ট নামে ডেকেও থাকি। এ প্রজন্মের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ওগুলোকে এ নামেই চিহ্নিত করতে অভ্যস্ত। কিন্তু আজ থেকে তিন-চার যুগ আগেও ফরিদপুরে, বিশেষ করে চরাঞ্চলে এ নামে ডাকা হতো না। তখন মোরগ-মুরগি শব্দ দুটোকে একসাথে ‘কুড়হ্যা’ বলে চিহ্নিত করা হতো। পরিচয় পৃথকীকরণের সময় ‘মর্দা কুড়হ্যা’ আর ‘ম্যায়া কুড়হ্যা’ বলে উল্লেখ করা হতো। অঞ্চলভেদে ‘মর্দা’ আর ‘মাইগ্গাও’ বলা হতো। এই কুড়হ্যা নিয়ে কত ঘটনা আর রটনা আছে, তা সবকিছু বলে শেষ প্রান্তে পৌঁছানো মুশকিল। তাই আজ কিছু কমন কথার অবতারণার প্রচেষ্টা…

আমাদের চরাঞ্চলে কুড়হ্যা পালনের জন্য এখনকার মতো অত প্রস্তুতি বা আয়োজনের প্রয়োজন পড়ত না। সর্বসাকুল্যে কাঠ, ছন বা বাঁশের বাতা দিয়ে বানানো একটি ‘খোপ’ই যথেষ্ট ছিল। কোনো কোনো বাড়িতে তাও থাকত না। ঘুমানোর ঘরে চৌকির নিচে ‘ভেঙে যাওয়া মাটির বড় ভাতের হাঁড়ি’ উল্টে দিয়ে ভেতরে কিছু ‘নাড়া’ বা ‘খড়’ দিয়ে ‘খাপড়া’ বানিয়ে, আর তার সাথে ‘ঘষি’র ছাই দিয়ে কুড়হ্যার থাকার ব্যবস্থা হতো। খোপ মাটি থেকে একটু উঁচুতে বাঁশ দিয়ে পোতা হতো। খোপের দরজার একপাশে একটি বাঁশ বা এক মুঠি ‘পাটখড়ি’ হেলিয়ে দেওয়া হতো। কুড়হ্যা ওই বাঁশ বা পাটখড়ির মুঠির সাহায্যে খোপে ঢুকত এবং বের হতো।

খুব ভোরে বা সুবহে সাদিকের সময় মর্দা কুড়হ্যা বাগ দিত। আলো ফুটতে না ফুটতেই খোপ থেকে কুড়হ্যা বের হয়ে আসত। ওরা বাড়ির ‘আলান-পালান’ দিয়ে ঘুরে ঘুরে, পোকামাকড় খেয়ে, নিজ দায়িত্বে ও নিজ গরজে হৃষ্টপুষ্ট হতো। সন্ধ্যায় আবার ওরা নিজেরাই খোপে ঢুকত। আবার ঘুমানোর ঘরে যেসব কুড়হ্যা থাকত, সকালে ‘গেরস্ত’ ঘুম থেকে উঠলেই কুড়হ্যা ঘর থেকে বের হতো। মাইগ্যা কুড়হ্যা বেলা ১০টা বা ১১টার দিকে ঘরের নির্দিষ্ট ‘খাপড়া’য় গিয়ে ডিম পেড়ে কড়কড় করতে করতে বের হয়ে আসত। খোপের কুড়হ্যাও একইভাবে খোপে ডিম দিত। তবে ‘ডিমের উপরে আসছে’ (ডিম দেওয়ার সময় হয়েছে) এমন কুড়হ্যা প্রথম দু-একদিন গেরস্তের বাড়ির ঘরের ভেতরে বা উঠানে এদিক-সেদিক ‘আতাম-বাতাম’ করত। তখন গৃহিণী বুঝতে পেরে তার জন্য ‘ডিম পারার ব্যবস্থা’ করে দিতেন।

তবে কুড়হ্যার খোপে কোনো কোনো বাড়িতে বা গ্রামে ‘খিড়কি’র ব্যবস্থা থাকত। মূলত শেয়াল, খাটাশ বা বেজির উৎপাতের উপর নির্ভর করে এটা করা হতো।

আমাদের গ্রামাঞ্চলে ‘কুটুম’ (আত্মীয়) আসলে সাধারণত ‘কুড়হ্যার সালুন’ করা হতো। সালুন বলতে আমাদের চরাঞ্চলে তরকারি বোঝানো হয়। সকালবেলা খোপ থেকে কুড়হ্যা ছেড়ে দেওয়ার পর আত্মীয়-স্বজন আসলে এই কুড়হ্যা ধরাটা খুবই কষ্টকর হতো। প্রথমে খাবারের লোভ দেখিয়ে ‘দুয়ারে’ (উঠানে) ‘আনা’ হতো। এরপর দুয়ারের যতগুলো ‘ফান্দি’ (পালানোর পথ) থাকত, সবগুলো ক্ষ্যাপলা জাল, বড় চাদর, কাপড়, তফন (লুঙ্গি) কিংবা ঘরের চাঙ্গের সাথে ঝোলানো চান্দা খুলে এনে ফান্দির মুখে দিয়ে আটকানো হতো। এরপর কুড়হ্যাকে দাবড় (তাড়া) দিলে ওটা ওই ফান্দির ফাঁদে আটকা পড়ত। তখন ওকে ধরে জবাই করা হতো।

সর্বসাকুল্যে কেজি খানেক মাংস হলেও গোল আলু মিশিয়ে শুকনো মরিচের ঝাল দিয়ে রান্না করে আত্মীয়-স্বজনসহ এক পরিবারের ৮/১০ জন মিলে একবেলা বেশ খাওয়া হতো। শুকনো মরিচের অতিরিক্ত ঝালে ছোট বাচ্চাদের মুখ লাল হয়ে যেত।

চলমান সময়ে সেই কুড়হ্যা পালন, কুড়হ্যার সালুন আর সেরকম আয়োজন বলতে গেলে একদম নাই হয়ে গেছে; শুধু মানসপটেই যার যেটুকু স্মৃতি অবশিষ্ট আছে…

লেখক : প্রবন্ধিক, ফরিদপুর।