✧───────── তৃপ্তি বালা ─────────✧

স্বজন-পরিজনহীন অস্থির এই সময়ে প্রতিক্ষণেই যখন সংশয়-সন্দেহ ঘিরে থাকে মনে, পরিচিত মানুষজনকে কেমন দূরের বলে বোধ হয়! ঘোরের মধ্য দিয়েই যেন পার হয়ে যায় একেকটি দিন। এর মাঝেই আবার সাড়া জাগে প্রাণে— পিতার মুখখানি স্মৃতিতে জাগরুক হয়। স্বজন-পরিজনে বেঁচে থাকার এবং বাঁচিয়ে রাখার নিয়ত সংগ্রাম-সাধনায় সিদ্ধ, প্রেমময় একখানি মুখ!

মানুষকে তার ধর্ম-বর্ণ, ভাষা কিংবা গোত্রের সীমায় বাঁধা যায় না; প্রকৃতির সহজাত সৃষ্টি মানুষ সাবলীলভাবেই তার জীবনাচার খুঁজে নেয়। জননীর মতোই জন্মভূমিও তার গর্ব ও আশ্রয়ের স্থান। এই ভূমি কিংবা রাষ্ট্রের কাছে তার সব সন্তান বা নাগরিকের থাকতে হয় সমান অধিকার। এরকমই কতোক সহজ সত্যের উপর পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল এই বাংলাদেশ।

আমার পিতা— গৌর চন্দ্র বালা ছিলেন সেই সৃষ্টি-সময়ের একজন কুশীলব। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টি তিনি পার করেছিলেন এই কাজে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষিত, ভারত সরকারের চাকুরিতে যুক্ত সদ্য বিবাহিত এক যুবক তার চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে জন্মভূমিতে ফিরে এসেছিলেন স্বজন-পরিজনের অনুরোধে।

দেশমাতৃকার উপযুক্ত এক সন্তানের দায়িত্বই পালন করেছিলেন তিনি। পূর্ব বাংলার অগণন সজাগ-সচেতন, শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত নিরীহ খেটে খাওয়া মানুষের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন আজীবনের জন্য। আজ তিনি আমাদের ইতিহাসেরই অংশ। সে কতকাল আগের কথা! রূপকথার এক কাহিনীর মতোই মনে হয় আজ!

১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী সম্মিলনে গঠিত ‘যুক্তফ্রন্ট’ স্বৈরাশাসক মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। যুক্তফ্রন্টের সেই নির্বাচনে জন্মস্থান মাদারীপুর থেকে মুসলিম লীগ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (১৯৫৪) নির্বাচিত হন গৌর চন্দ্র বালা।

১৯৫৫-এ তিনি গণপরিষদ সদস্য হন, এবং ১৯৫৬-এ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার বন ও খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধকালের দক্ষিণ-পশ্চিম বেসামরিক জোন-২ এর কার্যকারী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

এই যে মানুষটি— আমার বাবা, তাঁকে আমি কাছ থেকে পেয়েছি আমার কৈশোরে। সে ১৯৭৬ পরবর্তী সময়ের কথা! রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে তখন তিনি, খানিকটা অবকাশ-অবসরেরও সময়। পাঁচ ভাই-বোনের সবার ছোট এবং মেয়ে হবার কারণেও বাবার অনেকখানি বাড়তি বাৎসল্য-ভালোবাসা আমার ভাগ্যে জুটেছিল। আর মনে হয়, জ্ঞান হবার পর থেকেই তিনি আমার কাছে এক মহা কৌতুহলের মানুষ হয়েই উঠেছিলেন! তাঁর কথা, তাঁর বক্তব্য, তাঁর হাস্য-রসিকতা— সবটাই আমার আগ্রহের বিষয় ছিল।

বাড়িতে নিত্যদিনের বার্তা থেকে শুরু করে আগত অতিথি-অভ্যাগতের মাঝে বাবার উপস্থিতি, উপস্থাপন, মনের কথার স্পষ্ট প্রকাশভঙ্গী আমাকে আপ্লুত করতো। আমি যেন চলে যেতে পারতাম তাঁর সময়ে— আমার সময়ের অনেকটাই পিছনে— তাঁর কথার জাদুতে। বারান্দার টানা জায়গাটিতে বসে তিনি যখন স্মৃতিচারণ করতেন, এককোণে দাঁড়িয়ে থেকে আমি তাই শুনতাম। বাবার গুণমুগ্ধের অনন্য আরেকজন ছিলেন আমাদের হিরুভাই— দাদাদের বন্ধুপ্রতীম।

বাবা তাঁর সময়ের কথা বলতেন। পিতা ও পিতামহের কথা বলতেন। মায়ের মমত্বের কথা বলতেন। গ্রামের পাঠশালার কথা বলতেন। জমিদারের অন্যায়ের কথা বলতেন।

তিনি ড. বি. আর. আম্বেদকরের কথা বলতেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের কথা বলতেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের কথা বলতেন। তাঁদের কথা ও কাজ থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। ধর্ম-গোত্র-শ্রেণী ভেদহীন অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলতেন বাবা। উনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁর আলোকিত মানুষদের কথা বলতেন। রবি ঠাকুরের কবিতা তো নিয়ম করে উচ্চকণ্ঠে পাঠ করতেন বাবা।

ঠিক এই সময়েই খুব সকালে বারান্দার ছোট্ট টেবিলটিতে ইংরেজি বইটি খুলে নিয়ে আমি তাঁর অপেক্ষা করতাম। কবিতা, গদ্যের ইংরেজি থেকে বাংলা বুঝিয়ে দিতেন বাবা। সকালবেলাকার ঐ একটুকু পড়া সারাদিনের মতো আমার মনটাকে আনন্দে ভরিয়ে রাখতো। এরপরেও, জীবনে এগিয়ে চলার পথে বাবা আমাকে হাতে ধরে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন অনেকটা সময়।

তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি করে যেতে পারেন নি। পাঁচ ভাইবোন— আমরাই পিতা-মাতার সম্পদ।

ঠাকুরদা রাজমোহন বালার জমির উপর বাবা দুটি বিদ্যালয়— উল্লাবাড়ি প্রাথমিক ও উল্লাবাড়ি ইউনাইটেড হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গ্রামের ছেলেমেয়েরা অনায়াসে সেখানে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। ১৮ জুন, বাবার প্রয়াণ দিন। প্রণমি তোমারে পিতা! তুমি আছ আমাদের মাঝে স্বপ্নের স্বদেশ ভূমিতে!

লেখক: চিকিৎসক। সাবেক পরিচালক, মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, আজিমপুর, ঢাকা।