মাহ্ফুজা আক্তার ▪
পদ্মা-বিধৌত জনপদ ফরিদপুর। এই জনপদের ধুলিকণায় মিশে আছে শত বছরের ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা আর বীরত্বের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাসে ফরিদপুরের গুরুত্ব বহু প্রাচীন হলেও, প্রশাসনিকভাবে একটি সুসংগঠিত জেলা হিসেবে এর পথচলা শুরু হয়েছিল ১৮১৫ সালের ১ মে। আজ থেকে দুইশ বছরেরও বেশি সময় আগে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে এই দিনটি ফরিদপুরের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে।
ঐতিহ্যের শেকড়: ফতেহাবাদ থেকে ফরিদপুর
প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলটি ‘ফতেহাবাদ’ (বিজয়ের জনপদ) নামে সুপরিচিত ছিল। সুলতানি আমলে এটি ছিল বাংলার অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ টাকশাল। দিল্লির সুলতান জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহের আমলের মুদ্রায় এই অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। পরবর্তীতে এই মাটির পরম বন্ধু, প্রখ্যাত সুফি সাধক হজরত শাহ শেখ ফরিদউদ্দিন (রহ.)-এর অমর স্মৃতিকে ধরে রাখতে ফতেহাবাদ নাম পরিবর্তন করে ‘ফরিদপুর’ রাখা হয়।
১৮১৫: প্রশাসনিক কাঠামোর সূর্যোদয়
তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনের প্রশাসনিক সুবিধার্থে ১৮১৫ সালের ১ মে ঢাকাকে ভেঙে ফরিদপুরকে একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে ঘোষণা করে। সেই সময়কার প্রশাসনিক কাঠামোটি ছিল আজকের চেয়ে আয়তনে অনেক বড়। আজকের রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলাসমূহ তখন বৃহত্তর ফরিদপুর নামক এই বৃক্ষের একেকটি শাখা ছিল।
বিবর্তনের কালপঞ্জি:
১৮৪০ সাল: জেলা সদর দপ্তর স্থায়ীভাবে বর্তমান অবস্থানে স্থাপন করা হয়।
১৮৫০ সাল: ফরিদপুর পৌরসভা গঠিত হয়, যা নাগরিক সুযোগ-সুবিধার পথ প্রশস্ত করে।
রেল যোগাযোগ: ১৮৮৬ সালে গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেললাইন বিস্তৃত হলে কলকাতার সাথে ফরিদপুরের সরাসরি বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরি হয়।
পরিশেষে …
১৮১৫ সালের সেই ১ মে তারিখটি কেবল একটি দিন নয়, বরং এটি ছিল একটি জনপদের আত্মপরিচয় লাভের আনুষ্ঠানিক মুহূর্ত। নীল চাষ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ-ফরিদপুরের মানুষ সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
১৮১৫ সালে রোপিত সেই প্রশাসনিক বীজ আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে, যা আজকের ফরিদপুরকে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সচেতনতায় সমৃদ্ধ করেছে।