পাম্পে হাহাকার ও উত্তপ্ত রাজপথ
নিজস্ব প্রতিবেদক
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ফরিদপুরসহ পার্শ্ববর্তী রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও নড়াইলে তেলের জন্য চলছে চরম হাহাকার। গত কয়েক দিন ধরে অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় সচল থাকা পাম্পগুলোতে গভীর রাত থেকেই ভিড় করছেন শত শত চালক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন অনেকে। এই সংকটকে কেন্দ্র করে কোথাও ঘটছে মারামারি, কোথাও কৃষকদের বিক্ষোভ, আবার কোথাও ঝরছে রক্ত। সংকটের সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কালোবাজারি চক্র, যেখানে প্রতি লিটার তেল বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত চড়া দামে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা প্রশাসন বিভিন্ন পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ ও ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিলেও ভোগান্তি কমছে না সাধারণ মানুষের।
রাজবাড়ীতে মধ্যরাতে দীর্ঘ লাইন ও বিশৃঙ্খলা
রাজবাড়ী জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। জেলার ১০টি পাম্পের অধিকাংশ কয়েক দিন ধরে বন্ধ। সোমবার ভোরে জেলার পাঁচটি পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, সেহেরির আগে থেকেই মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। সদর উপজেলার করিম ফিলিং স্টেশনে বাঁশের বেড়া দিয়ে লাইন নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থেকেও তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন চালকরা। পাংশা থেকে আসা ব্যবসায়ী জামাল হোসেন জানান, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর মাত্র ২০০ টাকার তেল চাইলেও পাম্প কর্তৃপক্ষ তা দিতে রাজি হয়নি। অনেক জায়গায় পাম্পের সামনে লোহার ব্যারিকেড দিয়ে রাখা হয়েছে। রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজী ফিলিং স্টেশনে কয়েক শ মোটরসাইকেলের জটলায় বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। বাইক রাইডার আবু বক্কর জানান, চার দিন ধরে তেল না পেয়ে তিনি আয়-রোজগার বন্ধ করে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, সরবরাহ স্বাভাবিক করতে ম্যাজিস্ট্রেটদের তত্ত্বাবধানে তেল বিতরণের চেষ্টা চলছে।
শরীয়তপুরে কৃষকদের পাম্প ঘেরাও ও বিক্ষোভ
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে কৃষিখাতেও। শরীয়তপুরে ডিজেল না পেয়ে পাম্প ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন প্রায় দেড় শতাধিক কৃষক। শনিবার রাতে সদর উপজেলার মনোহর বাজার এলাকায় হাজী আবদুল জলিল ফিলিং স্টেশনের সামনে এই ঘটনা ঘটে। বোরো ও রবিশস্য আবাদের মৌসুমে সেচযন্ত্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল না পেয়ে কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, খুচরা বাজারে চড়া দামে তেল বিক্রি হলেও পাম্পগুলো থেকে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং কৃষকদের সীমিত পরিমাণে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। শরীয়তপুরে প্রতিদিন কৃষিকাজ ও মাছ ধরার নৌকার জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেলের চাহিদা থাকলেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অত্যন্ত নগণ্য।
নড়াইলে তেল না পেয়ে ট্রাকচাপায় ম্যানেজারকে হত্যা
জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে নড়াইলে ঘটেছে এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। সদর উপজেলার তানভীর ফিলিং স্টেশনে তেল না পেয়ে পাম্পের ব্যবস্থাপক নাহিদ সরদারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে চালক সুজাত মোল্যার বিরুদ্ধে। জানা গেছে, শনিবার মধ্যরাতে তেল না থাকায় সুজাতকে ফিরিয়ে দিলে তাদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সুজাত তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। রাত দুইটার দিকে নাহিদ মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার সময় সুজাত তার ট্রাক দিয়ে ধাওয়া করে নাহিদকে চাপা দেন। এতে ঘটনাস্থলেই নাহিদ নিহত হন। এই ঘটনায় নিহত নাহিদের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ ঘাতক চালক ও ট্রাকটি আটকের চেষ্টা চালাচ্ছে।
মাদারীপুরে তেলের জন্য জীবনযুদ্ধ
মাদারীপুরেও তেলের সংকট চরমে পৌঁছেছে। শহরের ইউসূফ ফিলিং স্টেশনে সোমবার দুপুরে তেলের ট্রাক এলে প্রায় দুই শতাধিক চালক হুমড়ি খেয়ে পড়েন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। অনেক সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী অফিসের কাজ ফেলে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম জানান, সকাল ৯টা থেকে দাঁড়িয়ে দুপুর ২টায় মাত্র ৩০০ টাকার তেল পেয়েছেন তিনি। এতে তার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ অনেক পাম্প বন্ধ থাকায় সচল পাম্পগুলোতে চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, কোনো পাম্প তেল মজুত করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত তদারকি চলছে।