◆ মো. মাহবুবুর রহমান ◆
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদটি শুধু একটি উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মুদ্রানীতি প্রণয়ন এবং আর্থিক খাতের সামগ্রিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব যতটা দক্ষ, নিরপেক্ষ ও দূরদর্শী হবে, ততটাই সেই দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রায়শই প্রশ্নের মুখে পড়েছে—এখানে কি যোগ্যতা প্রাধান্য পায়, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্যই মূল মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়?
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে। সেই সঙ্গে গভর্নর নিয়োগের ধরন ও মানদণ্ডও পরিবর্তিত হয়েছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে নিযুক্ত গভর্নরদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে এই দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিএনপির শাসনামলে গভর্নর নিয়োগ (১৯৯১–১৯৯৬ ও ২০০১–২০০৬)
১৯৯০-এর পর বিএনপি প্রথমবার ক্ষমতায় এলে গভর্নর হন খোরশেদ আলম (১৯৯২–১৯৯৬)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স এবং হার্ভার্ড থেকে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এলে গভর্নর হন ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ (২০০১–২০০৫)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) ও এমএ (প্রথম শ্রেণিতে প্রথম), উইলিয়ামস কলেজ থেকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে মাস্টার্স এবং প্রিন্সটন থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তীতে গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ (২০০৫–২০০৯)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স এবং ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন (aunque তার মেয়াদের শেষাংশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পড়ে)।
এই সময়ের গভর্নররা সবাই বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এতে বোঝা যায় যে বিএনপির শাসনামলে শিক্ষাগত মানদণ্ডের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে গভর্নর নিয়োগ (১৯৯৬–২০০১ ও ২০০৯–২০২৪)
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রথমবার ক্ষমতায় এলে গভর্নর হন লুৎফর রহমান সরকার (১৯৯৬–১৯৯৮)। তিনি আজিজুল হক কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। অর্থনীতিতে তার বিশেষায়িত কোনো উচ্চতর ডিগ্রি ছিল না, যা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
পরবর্তীতে ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন (১৯৯৮–২০০১) গভর্নরের দায়িত্ব পান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (অনার্স) ও এমএ (প্রথম শ্রেণিতে প্রথম) এবং বস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার সময়ে ব্যাংকিং খাতে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এলে গভর্নর হন ড. আতিউর রহমান (২০০৯–২০১৬)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসএস ও এমএসএস এবং লন্ডনের এসওএএস থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শাসনামলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও কৃষিঋণ সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিলেও ২০১৬ সালে রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটে, যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে বড় ধাক্কা। এই ঘটনার পর তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
এরপর গভর্নর হন ফজলে কবির (২০১৬–২০২২)। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ ও এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তার সময়ে ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও অর্থপাচারের অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
পরবর্তীতে আব্দুর রউফ তালুকদার (২০২২–২০২৪) গভর্নরের দায়িত্ব পান। তিনি আইবিএ থেকে এমবিএ এবং বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
এই পর্যায়ে দেখা যায় যে আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রথম দিকে উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি নিয়োগ পেলেও পরবর্তীতে শিক্ষাগত মান ও পেশাগত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এখানে রাজনৈতিক আস্থাই প্রধান বিবেচ্য হয়ে উঠেছে।
যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার বাস্তবতা:
শুধু ডিগ্রি থাকলেই দক্ষ গভর্নর হওয়া যায় না, আবার যোগ্যতা উপেক্ষা করলে দক্ষতাও টিকে থাকে না। ড. আতিউর রহমানের সময়ে রিজার্ভ চুরির ঘটনা দেখায় যে উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে ঋণখেলাপি ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করে যে প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে গভর্নরের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রাধান্য পেলে গভর্নর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ফলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার পরিবর্তে আপসের সংস্কৃতি তৈরি হয়।
কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট ও কুলিং পিরিয়ড: গভর্নর নিয়োগে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট (স্বার্থের সংঘাত) বিবেচনা করা অপরিহার্য। কোনো ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত স্বার্থ বা পূর্ববর্তী পেশাগত সম্পর্ক তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ পদে কাজ করেন বা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকেন, তবে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনে তিনি সেই স্বার্থ রক্ষায় প্রভাবিত হতে পারেন। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয় এবং আর্থিক খাতে ন্যায্যতা ও শৃঙ্খলা দুর্বল হয়।
এই কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে “কুলিং পিরিয়ড” একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা—অর্থাৎ সরাসরি রাজনৈতিক পদ বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত ২–৫ বছর) পার না হওয়া পর্যন্ত কাউকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় না।
পরিচালনা কাঠামো ও সংস্কারের প্রশ্ন: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেও অসংগতি দেখা যায়। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সংখ্যা মাত্র ১১। অথচ বাংলাদেশে বিগত সরকারের শাসনামলে তা বাড়িয়ে ৪৪ করা হয়। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সময় এই সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১৫ থেকে ১৮-এর মধ্যে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪-এ।
ড. সালেহউদ্দিনের পরামর্শ ছিল এই সংখ্যা কমানোর। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টার পরামর্শে একমত হয়ে আহসান এইচ. মনসুর নির্বাহী পরিচালকের সংখ্যা ৪০ থেকে কমিয়ে ৩৭-এ নামিয়ে আনেন। লক্ষ্য ছিল ২৫-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। প্রশ্ন উঠেছে—এই সংস্কার উদ্যোগের কারণেই কি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে তার প্রতি অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল?
এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে, কেবল ব্যক্তি নয়—পুরো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, যা দক্ষতা ও জবাবদিহিতার জন্য শুভ নয়।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ: আহসান এইচ. মনসুরের নেতৃত্বকালীন পরিবর্তন
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেশের বৈদেশিক লেনদেন সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট আহসান এইচ. মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন। সে সময় আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল প্রায় ১৮–২০ বিলিয়ন ডলার এবং গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৫.৯২ বিলিয়ন ডলার, যা নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
তার নেতৃত্বে নীতিগত সংস্কার ও ডলার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের ফলে রিজার্ভে উন্নতি ঘটে। ২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩০.৩০ বিলিয়ন ডলারে এবং গ্রস রিজার্ভ হয় ৩৫.০৩ বিলিয়ন ডলার। এই বৃদ্ধির পেছনে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ এবং ব্যাংকের কৌশলগত ডলার ক্রয় ভূমিকা রাখে।
যদিও রিজার্ভ এখনও আগের সর্বোচ্চ স্তর ($৪৮ বিলিয়ন) থেকে কম, তবু এই উত্থান অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। উল্লেখ্য, ২৫ ফেব্রুয়ারি তাকে গভর্নর পদ থেকে অপসারণ করা হলেও তার সময়ের সংস্কার উদ্যোগ রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
বারবার ফিরে আসা প্রশ্ন: যোগ্যতা নাকি আনুগত্য?
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানদণ্ডও বদলায়। বিএনপির শাসনামলে যোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ওপর জোর দেওয়ার উদাহরণ থাকলেও, আওয়ামী লীগের সময়ে নীতির ধারাবাহিকতা ও সংস্কার নিয়ে মিশ্র মূল্যায়ন রয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাজনৈতিক আনুগত্য ক্রমশ প্রভাবক ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে—গভর্নর নিয়োগে যোগ্যতা মুখ্য হবে, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্যই চূড়ান্ত বিবেচ্য? দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল ব্যক্তি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, বরং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল সংস্কার প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি ‘নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন সার্চ কমিটি’ গঠন এবং একটি ‘সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ নিয়োগ নীতিমালা’ প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। এই নীতিমালার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, অর্থনীতিতে দক্ষ এবং রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
গভর্নর পদটি কোনো দলের পুরস্কার নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনা। কারণ এখানে একটি ব্যক্তির নিয়োগ নয়—এটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
সহায়ক সূত্র:
১. বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মামুনুর রশিদের ‘পোস্ট’ এর সাথে সাক্ষাৎকার
২. বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
লেখক:
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ফরিদপুর সিটি কলেজ
Email: mmrrajbari71.com