বাবাকে হারানোর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি লিওনেল মেসি। ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন এই সময়ে আর্জেন্টাইন মহাতারকার পাশে দাঁড়িয়েছে তার ক্লাব ইন্টার মিয়ামি। তবে এই মুহূর্তে মেসিকে নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা বা ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন না করার আহ্বান জানিয়েছেন মিয়ামির কোচ গিয়ের্মো হয়োস। তার মতে, মেসির এ সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন- নীরবতা, শান্তি ও ব্যক্তিগত পরিসর।

মেসির বাবা হোর্হে মেসি গত ৮ আগস্ট আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের একটি হাসপাতালে মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মেসি আর্জেন্টিনায় যান। পরে রোববার রাতে রোজারিও থেকে মিয়ামিতে ফিরে দলের সঙ্গে যোগ দেন তিনি।

শুক্রবার মেসিকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হয়োস বলেন, শোক কাটিয়ে ওঠার বিষয়টি রাতারাতি সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ মেসিকে দিতে হবে।‘সবকিছু ধীরে ধীরে এগোতে হবে। এখানে গভীর শোক জড়িয়ে আছে। এমন কিছু নয় যে রাতারাতি সবকিছু বদলে যাবে,’ বলেন মিয়ামি কোচ।

মেসির ব্যক্তিগত সময় ও অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন হয়োস। তার মতে, এ সময়ে মেসির পাশে থাকার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তার নীরবতাকে সম্মান করা।

‘আমার মনে হয়, নীরবতাই সবচেয়ে ভালো পথ। নীরবতা, প্রশান্তি ও শান্তি- তাকে নিজের মতো করে সময় খুঁজে নিতে দিতে হবে। আমাদেরও সেই নীরবতার অংশ হয়ে তার পাশে থাকতে হবে। আমার কাছে নীরবতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত সেটিই একজন মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নিতে সাহায্য করে,’ বলেন তিনি।

বাবার মৃত্যুর পর মেসি রোজারিওতে গিয়ে একটি ব্যক্তিগত স্মরণসভায় যোগ দিয়েছেন বলে আর্জেন্টিনার বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এরপর মিয়ামিতে ফিরে বুধবার লিগস কাপের ম্যাচে ক্লাব লেওনের বিপক্ষে মাঠে নামেন তিনি।

তবে ম্যাচটি শুরু করেন বেঞ্চে বসে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন মেসি। মাঠে প্রবেশের সময় স্টেডিয়ামের দর্শকেরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। ব্যক্তিগত জীবনের এমন কঠিন সময়েও দলের হয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্তে মেসির মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসা করেছেন হয়োস।

‘তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বলার মতো কোনো শব্দ নেই। একজন মানুষ হিসেবে তার মূল্যকে কোনো একটি শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমরা শুধু একজন ফুটবলারের মূল্য নিয়ে কথা বলছি না; আমরা এমন একজন অসাধারণ মানুষকে নিয়ে কথা বলছি, যার হৃদয় বিশাল। কখনো কখনো শব্দ যথেষ্ট হয় না,’ বলেন মিয়ামি কোচ।

শুক্রবার দলের সঙ্গে অনুশীলনেও অংশ নিয়েছেন মেসি। শনিবার মেজর লিগ সকারে ন্যাশভিল এসসির বিপক্ষে ম্যাচ রয়েছে ইন্টার মিয়ামির। সেই ম্যাচে মেসির কত মিনিট খেলা উচিত কিংবা তাকে কিভাবে ব্যবহার করা হবে- এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েও হয়োস আবারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি সামনে আনেন।

মেসির সঙ্গে যোগাযোগ ও তার খেলার সময় নিয়ে বিস্তারিত জানাতে চাননি মায়ামি কোচ। তার যুক্তি, কিছু বিষয় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং সেগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা উচিত নয়। ‘কিছু বিষয় গভীরভাবে ব্যক্তিগত। আপনাদের প্রত্যেকেরও যেমন ব্যক্তিগত বিষয় রয়েছে। আমি যদি এসে আপনাদের একের পর এক প্রশ্ন করি, আপনারাও হয়তো বলবেন, এটা ব্যক্তিগত,’ বলেন হয়োস।

তিনি আরও বলেন, ‘এ কারণেই আমি নীরবতার কথা বলছি। এমন একটি বিষয়কে অনেকেই মূল্য দেন না। মানুষ কথা বলতে এবং নিজের মতামত দিতে ভালোবাসে। কিন্তু আমার কাছে বিষয়টি হলো ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সত্যিকার অর্থে সম্মান করা।’

মেসির বর্তমান অবস্থাকে স্বাভাবিক মানবিক বাস্তবতা হিসেবেই দেখছেন হয়োস। তাঁর মতে, শোকের এই সময়ে মেসিকে কোনো ধরনের বাড়তি চাপ দেওয়া উচিত নয়।

‘সে এমন একজন মানুষ, যে কিছু কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আমরা সেটিকে গভীরভাবে সম্মান করি,’ বলেন তিনি।

বাবা হোর্হে মেসির সঙ্গে মেসির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরু থেকে তার বাবাই ছিলেন মেসির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা ও প্রতিনিধি। তাই বাবাকে হারানোর এই ধাক্কা মেসির জন্য কতটা কঠিন, সেটিও স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় এসেছে।

তবে আপাতত মাঠের বাইরের বিষয় নিয়ে না ভেবে মেসিকে নিজের মতো করে সময় দিতে চায় ইন্টার মিয়ামি। ন্যাশভিলের বিপক্ষে ম্যাচের পর আগামী বুধবার ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের বিপক্ষেও মাঠে নামবে মিয়ামি। সেই ম্যাচে মেসির ভূমিকা কী হবে, তা নির্ভর করবে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপরই।

এই মুহূর্তে মেসির জন্য ফুটবলের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে পরিবার ও ব্যক্তিগত শোক। আর সেই কারণেই তার পাশে থাকার সবচেয়ে বড় বার্তা হিসেবে নীরবতাকেই বেছে নিয়েছেন ইন্টার মায়ামির কোচ।