ঢাকাবুধবার , ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  1. অর্থনীতি
  2. আইন
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলাধুলা
  5. জাতীয়
  6. টপ নিউজ
  7. ধর্ম
  8. ফিচার
  9. বিনোদন
  10. রাজনীতি
  11. লাইফস্টাইল
  12. লিড নিউজ
  13. শিক্ষাঙ্গন
  14. সম্পাদকীয়
  15. সারাদেশ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিক্ষাখাতের কালো অধ্যায়: দুর্বলতম ছাত্রটিই শিক্ষক হয়ে গেল

Doinik Kumar
ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬ ১:১৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

59

মো. মাহবুবুর রহমান

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষক নেতার বৈঠকের একটি ভিডিও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সেই ভিডিওটি দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত ও হতবাক হয়ে পড়েছি। সেই ভিডিওটি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক কালো অধ্যায়ের কথা—যেখানে দুর্বলতম ছাত্রটিই হয়ে উঠেছে শিক্ষক। কিন্তু এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে প্রথমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরা জরুরি। এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করা নয়; বরং শিক্ষক হয়ে ওঠার একটি বিকৃত প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করে শিক্ষাব্যবস্থার মূলে লুকিয়ে থাকা সংকটকে উন্মোচন করা।

১. শিক্ষক তৈরির বিকৃত বাস্তবতা: আশি–নব্বইয়ের দশক
আশি ও নব্বইয়ের দশকে বহু শিক্ষকের শিক্ষক হয়ে ওঠার গল্প শিক্ষার আদর্শের চরম বিপরীত ছিল। বাস্তবতা ছিল প্রায় এমন—পড়ালেখায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অন্য কোথাও চাকরি না পেয়ে স্থানীয় সূত্রে টাকা-পয়সা বা প্রভাব খাটিয়ে বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় প্রবেশ করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁরা বাড়িতে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন, যেখানে অনেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের দুর্বলতাকেই পুঁজি করে একটি নির্ভরশীলতার বাজার তৈরি করেছিলেন।

তুলনামূলক কঠিন বিষয়—যেমন গণিত, পদার্থবিজ্ঞান বা ইংরেজির শিক্ষকেরা প্রাইভেট পড়ানোর পথ বেছে নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক না হয়েও সেই বিষয়ে প্রাইভেট পড়ান। কারণ অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই ইংরেজিতে দুর্বল। এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে তারা ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রাইভেট পড়ান শুধু অতিরিক্ত টাকা আয়ের লক্ষ্যে। ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষকদের মান যাচাই করার মতো যোগ্যতা নেই। এটি এক ধরনের প্রতারণা ও দুর্নীতি।
অন্য শিক্ষকেরা জীবিকার প্রয়োজনে ভিন্ন কাজে যুক্ত হন—কেউ ব্যবসা করেন, কেউ কোচিং সেন্টার চালান, আবার কেউ সরাসরি রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়েন। কলেজ পর্যায়ে নিয়োজিত শিক্ষকেরা অনেকে দূরের কলেজে সুবিধামতো সময়ে যান। তারা ধীরে ধীরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন এবং একসময় সরকারি হয়ে যাওয়া সেই কলেজ থেকেই অবসর নেন। অনেকের জীবনে কোনো প্রথম বিভাগ বা প্রথম শ্রেণি ছিল না, কিন্তু নেটওয়ার্ক ও প্রভাবের জোরে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও তাঁরা প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত হয়েছেন।
দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, গত ২৫–৩০ বছরে দেশের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসরকারি স্কুল ও কলেজে পরিবারের সবচেয়ে দুর্বল ছাত্র বা ছাত্রীটিই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে।

২. গ্রামীণ বাস্তবতা ও অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকতা:  গ্রামীণ বাংলাদেশের একটি পরিচিত চিত্র—ছেলেরা পড়াশোনায় খারাপ করলে বাড়িতে বসে থাকত। এমন চিত্র ছোটখাটো শহরেও বিচিত্র নয়। বন্ধু ও পরিবারের চাপে বিএ-এমএ পাস করলেও ফল ভালো হতো না। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করে অভিভাবকদের প্রস্তাব দিতেন— “আপনার পোলারে শিক্ষক বানাইয়া দিমু, কয়েক লাখ টাকা দেন।” বাবা-মা খুশি হয়ে টাকা জোগাড় করতেন। ব্যস, বাড়ির সবচেয়ে কম মেধার সন্তান হয়ে যেত শিক্ষক। এটাই ছিল এক সময়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রধান চিত্র। এই বাস্তবতা কি আমাদের অজানা? শিক্ষামন্ত্রী নিশ্চয়ই জানেন।

৩. মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবচিত্র: শুধু সাধারণ শিক্ষাখাতেই নয়, মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার চিত্রও ছিল আরও করুণ—একসময় গ্রামীণ সমাজে পড়ালেখায় সবচেয়ে দুর্বল ছেলেটিকেই মাদ্রাসায় পাঠানোর প্রবণতা ছিল ব্যাপক। কারণ ধারণা করা হতো, মাদ্রাসায় পড়লে কম খরচে ও সহজ শর্তে লেখাপড়া করা যায়। সেই দুর্বল ছাত্রটিই পরে অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসার শিক্ষকে পরিণত হতো। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার মানও পড়ে যায় নিম্নস্তরে। যাঁরা সাধারণ শিক্ষায় নিজেদের অযোগ্য প্রমাণ করেছিলেন, তাঁরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিতেন। মাদ্রাসা শিক্ষকদের একটি বড় অংশের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা যেমন কম ছিল, তেমনি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও পদ্ধতিগত শিক্ষাদানে তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগের এই বিকৃত প্রক্রিয়া মাদ্রাসা শিক্ষাকেও গ্রাস করেছিল, যা আজও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৪. পারিবারিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবসা: এই বিকৃত প্রক্রিয়া শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং একটি বৃহত্তর কাঠামো তৈরি হয়েছিল—অনেকে নিজের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছেন। পরিবারের বাইরে টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কয়েক বছর পর সেই শিক্ষকরাই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বা লেনদেনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানপ্রধান হয়েছেন।

এভাবে একটি চক্র তৈরি হয়—যেখানে প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থের হাতিয়ার, আর শিক্ষার মান থাকে উপেক্ষিত। মনে রাখা উচিত, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেমন হবে, তা মূলত ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ওপর নির্ভর করে। এর প্রমাণ হিসেবে দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দক্ষতা, সততা ও নৈতিক মান অনুসারে শিক্ষার মানও উর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী হয়েছে।

৫. নিয়োগব্যবস্থার বিবর্তন ও সীমাবদ্ধতা: নিবন্ধন পরীক্ষা চালুর আগে নিয়োগ হতো পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তে—টাকা, আত্মীয়তা বা প্রভাবের ভিত্তিতে। মেধা ছিল গৌণ। ২০০১ সালে বিএনপি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষা মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক ও প্রতিমন্ত্রী এএনএম হাসানুল হক মিলনের নেতৃত্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রথম নিবন্ধন পরীক্ষা চালু হয়। এই উদ্যোগ শিক্ষক নিয়োগে মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের পথ খুলে দেয় এবং পরবর্তীতে এনটিআরসি গঠনের মাধ্যমে এই পরীক্ষা পদ্ধতি আরও সুসংহত রূপ লাভ করে। এটি ছিল একটি ইতিবাচক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন।

তবে সমস্যা থেকে যায়—প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের ক্ষমতা রয়ে যায় পরিচালনা কমিটির হাতে। ফলে অযোগ্য ব্যক্তিরাই নীতিনির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন। সাম্প্রতিক উদ্যোগে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগেও এনটিআরসির মাধ্যমে ব্যবস্থা চালু করে, যা ছিল ইতিবাচক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু শিক্ষক সংগঠন এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আবার পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সুপারিশ করছে।

বাস্তবতা হলো—প্রতিষ্ঠানপ্রধান যদি দক্ষ, সৎ ও যোগ্য না হন, সাধারণ শিক্ষকরা একা কোনো প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ঘটাতে পারবেন না। কারণ চালকের আসনে থাকেন প্রতিষ্ঠানপ্রধানই।

৬. ইংরেজি দুর্বলতার ঐতিহাসিক উৎস: দেশে ইংরেজিতে দুর্বলতার একটি বড় ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে—এরশাদ সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ডিগ্রি কলেজগুলোতে বাধ্যতামূলক ইংরেজি পরীক্ষা তুলে দেওয়া হয়। অন্যদিকে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজগুলোতে তা বাধ্যতামূলক থাকায় শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে ভিড় করে।

ফলে ইংরেজি ছাড়া ডিগ্রি পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ে। এঁরাই পরে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হন এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে ম্যানেজ করে ইংরেজি ক্লাস নিতে শুরু করেন। এর ফলেই শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমানে বিষয়ভিত্তিক নিয়োগ চালু হওয়ায় কিছুটা উন্নতি হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সময় লাগবে।

৭. মন্ত্রীর প্রশ্ন ও শিক্ষক নেতাদের নীরবতা: ভিডিওতে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষক নেতাদের একটি সহজ কিন্তু গভীর প্রশ্ন করেন—”আপনারা নিজেদের সুবিধার জন্য এত দাবি করছেন, মানলাম। কিন্তু এর বিনিময়ে শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আপনারা কী করবেন?” কিন্তু সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে শিক্ষক নেতারা বারবার প্রসঙ্গ বদলাচ্ছেন। তাঁদের বয়স ও বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, তাঁদের অনেকেই ওই বিকৃত প্রক্রিয়াতেই শিক্ষক হয়েছেন। তাই শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে কোনো মহৎ পরিকল্পনার অঙ্গীকার তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়।

৮. মূল সংকট: মানুষে ও পেশাগত নৈতিকতা
মাননীয় মন্ত্রী শিক্ষকদের আর্থিক দুরবস্থার কথা জানেন। কিন্তু তার চেয়েও ভয়াবহ হলো তাঁদের মানসিক দুরবস্থা ও পেশাগত নৈতিক অবক্ষয়। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে টাকা দিয়ে, প্রভাব খাটিয়ে, আত্মীয়তার সুবাদে কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় যোগ্যতা ছাড়াই শিক্ষক হয়েছেন—তাঁদের কাছ থেকে শিক্ষাব্যবস্থার জন্য কোনো দায়বদ্ধতা বা মহৎ পরিকল্পনার অঙ্গীকার আশা করা যায়?

এখন প্রশ্ন অনিবার্য—যে ব্যবস্থায় শিক্ষক নির্বাচন হয়েছে লেনদেন ও লবির মাধ্যমে, সেখানে শিক্ষার মান কীভাবে রক্ষা পাবে? যে ব্যবস্থায় শ্রেষ্ঠ ছাত্র শিক্ষক হয়নি, সবচেয়ে দুর্বল ছাত্র শিক্ষক হয়েছে—সেখানে জাতি কীভাবে আলোকিত হবে?

অনেক পরিবারের শিক্ষিত মহিলারাও সামাজিক পরিচিতি লাভের জন্য শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করেছেন। এরা পেশার প্রতি আন্তরিক নয়, বরং সামাজিক স্বীকৃতি ও সুবিধার জন্য এই পেশা বেছে নিয়েছেন।

শুধু তাই নয়, শিক্ষকতার মত মহান পেশাকে অনেকে ব্যবহার করেন সাইনবোর্ড হিসেবে। বেতন-ভাতার অপ্রতুলতা ও জীবনধারণের জন্য আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শিক্ষক ইন্সুরেন্স, কাজী, সাংবাদিকতা ও ব্যবসার মতো বিবিধ পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। টিকে থাকার তাগিদে এবং বাড়তি উপার্জনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই তাঁরা মূল পেশার পাশাপাশি এসব পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হন। কিন্তু এই প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয় এবং অনেকে এসব পেশাকে মূল পেশা থেকেও বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এই প্রবণতা শিক্ষকতা পেশার মর্যাদার জন্য চরম অবমাননাকর এবং শিক্ষাব্যবস্থা পিছিয়ে থাকার আরেকটি বড় কারণ। একজন প্রকৃত শিক্ষক যখন আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর মূল দায়িত্বকে গৌণ করে অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন তার শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শিক্ষার মান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায় এবং একে কেন্দ্র করে এক ধরনের দুষ্টুচক্র তৈরি হয়।

৯. উত্তরণের পথ: শিক্ষক তৈরির যে প্রক্রিয়া বিকৃত হয়েছে, তার মূল্য আজ গোটা জাতি দিচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—দুই সময়ের জন্যই সমান্তরাল উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। মেধাবীরা যতদিন শিক্ষক পেশাকে আকর্ষণীয় না মনে করবেন, ততদিন শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বর্তমান শিক্ষকদের জন্য করণীয়:
ইতিমধ্যে যাঁরা শিক্ষকতা পেশায় রয়েছেন, তাঁদের দক্ষতা ও নৈতিকতা বৃদ্ধির জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। তবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যথেষ্ট নয়, এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিয়মিত মনিটরিং। পাশাপাশি পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টন হতে হবে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মূল্যায়নমূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে। তবেই যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দায়িত্ব পাবেন, যা একটি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক মানোন্নয়নের পূর্বশর্ত।

পেশাগত দায়িত্বে শিক্ষকদের মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে পদোন্নতিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এই ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষকরা নিজেদের আপডেট রাখতে বাধ্য হবেন এবং টিকে থাকার তাগিদে অন্যান্য পেশায় মনোনিবেশ না করে মূল দায়িত্বের প্রতিই বেশি আন্তরিক হবেন—এটা আশা করা যায়।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষক তৈরিতে:
শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছ ও কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, যেখানে মেধাই হবে একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের আমলে শিক্ষা মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক ও প্রতিমন্ত্রী এএনএম হাসানুল হক মিলনের নেতৃত্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নিবন্ধন পরীক্ষা চালুর মাধ্যমে যে মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন শুরু হয়েছিল, তা যেন কোনো অবস্থাতেই পিছিয়ে না যায়—বরং আরও শক্তিশালী হয়।

শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এমন পর্যায়ে উন্নীত করা প্রয়োজন, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই পেশাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে নেয় এবং জীবনধারণের তাগিদে অন্য পেশায় মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন না হয়। শুধু পুরোনো কাঠামো পরিবর্তন করলে চলবে না, নতুন প্রজন্মের মেধাবীদের আকর্ষণ করতে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষার জন্যও আলাদা মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক। মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন না হলে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

শেষ কথা: ফিরে দেখা, না কি এগিয়ে দেখা? শিক্ষামন্ত্রীর সেই প্রশ্নটি এখনো অনুরণিত হচ্ছে—শিক্ষক নেতারা নিজেদের সুবিধার কথা বলেন, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার জন্য তারা কী করবেন? এই প্রশ্নের জবাব শুধু শিক্ষক নেতাদের নয়, আমাদের সবার দেওয়ার কথা। যে ব্যবস্থায় দুর্বলতম ছাত্রই শিক্ষক হয়েছে, সেখানে দোষ শুধু কি তাদের? না কি এমন এক ব্যবস্থার দায় আমাদেরও আছে, যেখানে মেধাকে অবহেলা করে প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছি?

আমরা কি শুধুই সমালোচনা করে থেমে থাকব? নাকি ভাবব—আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন শিক্ষক চাই? কেমন শিক্ষাব্যবস্থা চাই? শিক্ষকদের আর্থিক সংকট দূর করা, পেশাগত মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া, মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া—এই কাজগুলো কি শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব? নাকি অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী—আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন?

একটা কথা মনে রাখা ভালো—শিক্ষক যদি আলোকিত না হন, তবে শিক্ষার্থী আলোকিত হবে কোথায়? শিক্ষক যদি দুর্বল হন, তবে জাতি শক্তিশালী হবে কীভাবে? শিক্ষকতা যদি সাইনবোর্ড হয়, তবে জাতি গড়ার কারখানা চলবে কিসের ওপর ভর করে?

অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা সামনে এগোতে চাই, তাহলে এখনই সময়—শিক্ষক তৈরির সেই বিকৃত প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করে নতুন করে শুরু করার। সময় এখন শুধু প্রশ্ন তোলার নয়, সময় এখন জবাব খোঁজার। সময় এখন ফিরে দেখার নয়, সময় এগিয়ে দেখার।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।