বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিজয় বারবার এসেছে—উচ্ছ্বাস, আশা ও প্রতিশ্রুতির জোয়ার নিয়ে। কিন্তু ক্ষমতার মোহে নেতৃত্ব যখনই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সেই বিজয় তখনই ম্লান হয়েছে; ফিরে এসেছে স্বৈরাচারী শাসন। এই বৃত্ত ভাঙাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয় এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নির্বাচন-পরবর্তী বক্তব্যে তাঁর সংযম, দায়িত্ববোধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ইঙ্গিত আশাব্যঞ্জক। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে এক ভিন্ন ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। তবে ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে—ক্ষমতা অনেক সময় মানুষকে বদলে দেয়।
‘উইনার টেকস ইট অল’ বা ‘বিজয়ীই সব ভোগ করবে’—এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে নতুন সরকারও পুরনো ভুলের পথেই হাঁটবে। তাই এই জয়কে গন্তব্য নয়, বরং একটি নতুন যাত্রার সূচনা হিসেবে দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে, সত্যিকারের জয় হলো জনগণের আস্থা ধরে রাখা।
আস্থা ধরে রাখার প্রথম শর্ত হলো সংসদ ও রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ও গঠনমূলক বিরোধী দলের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। জাতীয় সংসদে কার্যকর বিরোধী দলই গণতন্ত্রের প্রাণ। তাদের কেবল প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং গঠনমূলক সমালোচক হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বাজেটের অসংগতি, আইনের অপব্যবহার কিংবা নীতিগত ত্রুটি তুলে ধরা তাদের মৌলিক দায়িত্ব। সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করে। অতীতে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার ফলে একমুখী সিদ্ধান্ত ও ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এই বৃত্ত ভাঙতে হলে বিরোধী দলকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও কার্যকর সুযোগ দিতে হবে।
একই সঙ্গে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার দায় বিরোধী দলেরও। তাদের সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর ও বাস্তবসম্মত। সংসদ অচল করার পুরনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সরকারকে দেশ ও জনগণের স্বার্থে আরও স্বচ্ছভাবে কাজ করতে বাধ্য করা।
শুধু শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলেই গণতন্ত্র টেকসই হয় না; প্রয়োজন একটি সচেতন ও আলোকিত জনগোষ্ঠী, যারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর অতন্দ্র প্রহরীর মতো নজর রাখবে। সচেতন ভোটাররাই প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান বুঝতে পারেন এবং নেতৃত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনতে সক্ষম হন। ডিজিটাল যুগে গুজব ও অপপ্রচারের স্রোত রুখতে শিক্ষিত সমাজই সবচেয়ে কার্যকর ঢাল। সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নজরদারি মূলত শিক্ষারই ফসল। তবে এই শিক্ষা যেন কেবল সনদসর্বস্ব না হয়; একে হতে হবে মানবিক মূল্যবোধ ও যৌক্তিক চিন্তার ধারক। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে মেধাভিত্তিক পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, উন্নত শিক্ষা ও সুশাসন কীভাবে প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করতে পারে।
শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দাবির মুখেই গড়ে তুলতে হবে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। নতুন সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করা। বিজয়ী দলের নেতৃত্বকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—দখলদারি ও প্রতিশোধের রাজনীতি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। রাষ্ট্রপ্রধানকে কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং পুরো দেশের অভিভাবক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে।
মন্ত্রিসভা গঠন ও প্রশাসনিক নিয়োগে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে মেধা, যোগ্যতা ও সততাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। তোষামোদের সংস্কৃতি ভেঙে এমন একটি টিম গঠন করতে হবে, যারা আধুনিক ও বিশ্বমানের রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষম। বিষয়ভিত্তিক দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিলে আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা কমবে এবং দুর্নীতির সুযোগও সংকুচিত হবে।
গণতন্ত্র মানে কেবল পাঁচ বছর পর পর ভোট দেওয়া নয়; গণতন্ত্র মানে প্রতিদিনের জবাবদিহিতা। গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিকদের নির্ভয়ে প্রশ্ন করার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব। ক্ষমতা যখন সেবার বদলে ভোগের মাধ্যমে পরিণত হয়, তখন পতন অনিবার্য—এই চিরন্তন সত্য নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা প্রয়োজন।
তারেক রহমানের সামনে আজ ইতিহাস গড়ার সুযোগ। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি যদি একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা উপহার দিতে পারেন, তবে এই বিজয় কেবল রাজনৈতিক নয়, জাতীয় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। বিজয়ের আসল পরীক্ষা আসনের সংখ্যায় নয়, বরং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার সক্ষমতায়।
সচেতন নাগরিক, শক্তিশালী বিরোধী দল, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ও মেধাভিত্তিক প্রশাসন—এই চারটি স্তম্ভ শক্ত হলে এ দেশের গণতন্ত্র হবে টেকসই। সময়ই বলবে, আমরা কি এই পুরনো বৃত্ত ভাঙতে পারব।
দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমেই সরকার স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে—আগামী বাংলাদেশ কেমন হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই দৃষ্টান্ত থেকে স্পষ্ট সংকেত পাবে যে, সঠিক পথে ও দক্ষতার সাথে কাজ করলেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব। ফলে একসময় রাষ্ট্রযন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সচল হয়ে দুর্বার গতিতে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। পাশাপাশি, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাও নিজেদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বাধ্য হবেন; তারা নিজের থেকেই রাষ্ট্রীয় ভূমিকা পালনে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠবেন। সেই দিকেই জনগণ আজ আশাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ।
লেখক :মো.মাহবুবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর।
