দীর্ঘ ১৮ মাসের প্রতীক্ষা আর সংস্কারের পথ বেয়ে আজ এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর আজ বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রীকে শপথ বাক্য পাঠ করান।
এবারের মন্ত্রিসভার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, দলের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ এবং রাজপথের পরীক্ষিত সৈনিকদের দপ্তরের দায়িত্ব বণ্টন। রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেধা ও দক্ষতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন।
নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যাঁরা ঠাঁই পেয়েছেন, তাঁদের দপ্তর বণ্টন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। দলের মহাসচিব এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেওয়া হয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন ও সংস্কারের গুরুভার এখন তাঁর কাঁধে।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কূটনীতিতে পারদর্শী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পেয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়নই হবে তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ।
নির্বাসন ও আইনি লড়াই শেষ করে ফেরা প্রভাবশালী নেতা সালাহউদ্দিন আহমদকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা তাঁর প্রথম লক্ষ্য। বিদ্যুৎ খাতের গভীর জ্ঞানসম্পন্ন নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু পেয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
রণাঙ্গনের বীর মেজর অবসরপ্রাপ্ত হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমকে তাঁর উপযুক্ত ক্ষেত্র মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে। প্রশাসনের ভারসাম্য রক্ষায় দক্ষ নেতাদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনকে একই সাথে মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মো. আসাদুজ্জামানকে দেশের বিচার ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। আসাদুল হাবিব দুলুকে দুর্যোগ মোকাবিলা ও আর্তমানবতার সেবায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দলীয় রাজনীতির বাইরেও মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে বিশেষজ্ঞ কোটায় দায়িত্ব পেয়েছেন ড. খলিলুর রহমান। অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে সফল এই ব্যক্তিত্বকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে তাঁর ওপর বিশেষ আস্থা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বিশাল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। আরিফুল হক চৌধুরীকে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জহির উদ্দিন স্বপন তথ্য ও সম্প্রচার, মিজানুর রহমান মিনু ভূমি এবং নিতাই রায় চৌধুরী সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
আফরোজা খানম রিতাকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন, মো. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিকে পানি সম্পদ, জাকারিয়া তাহেরকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত এবং দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ধর্ম বিষয়ক এবং আব্দুল আউয়াল মিন্টু পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।
শপথ গ্রহণ করলেও দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও পাননি চার প্রভাবশালী নেতা। ধারণা করা হচ্ছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো এদের মধ্যে বণ্টন করা হতে পারে। আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পেতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ এবং ফকির মাহবুব আনাম স্বপনকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া শেখ রবিউল আলমকে সড়ক পরিবহন ও সেতু অথবা রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
শপথ অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর মন্ত্রিসভাকে বিলাসিতা পরিহার ও জনগণের প্রকৃত সেবক হওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, এই মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যই সরকারি শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট গ্রহণ করবেন না, যা একটি বিরল ও প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত। ২৫ সদস্যের এই শক্তিশালী মন্ত্রিসভা আজ রাত থেকেই তাদের দাপ্তরিক কাজ শুরু করবে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করা, বৈদেশিক সম্পর্কে নতুন গতি আনা এবং প্রশাসনিক সংস্কার সম্পন্ন করাই হবে এই সরকারের মূল কাজ। ১৮ মাসের সংস্কার শেষে নির্বাচিত এই সরকারের হাত ধরে বাংলাদেশ এক সমৃদ্ধ ও আধুনিক রাষ্ট্রের পথে যাত্রা শুরু করল।
