ঢাকায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটজ জানিয়েছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ক্ষেত্রে জার্মানিসহ পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নীতিগত অবস্থান অপরিবর্তিত তারা মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করে না। তবে তিনি এটিও বলেন যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে শেখ হাসিনার বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়া প্রয়োজন ছিল।
জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত এক আলোচনায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জার্মান রাষ্ট্রদূত এসব কথা বলেন।
রুডিগার লোটজ বলেন, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেকোনো মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। শেখ হাসিনার রায় সম্পর্কেও আমাদের অবস্থান একই। তবে আইনের শাসনের পথে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে বিচার প্রক্রিয়ার প্রয়োজন ছিল এটি সত্য।
তিনি আরও জানান, কোনো মামলায় বিচারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও শাস্তির ধরন হতে হবে মানবাধিকারসম্মত এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্পন্ন। জার্মানি সে মূল্যবোধেই অটল।
জুলাই সনদ অনুযায়ী বাংলাদেশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মন্তব্য করেন লোটজ। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যেসব সংস্কার শুরু হয়েছে, তা কেবল সরকার নয় সকল রাজনৈতিক দলেরই দায়িত্ব। এসব সংস্কার নির্বাচনের পরও একইভাবে চলতে হবে।
জার্মানি সরকারের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এ পরিবর্তন সুসংহত করতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জার্মান রাষ্ট্রদূত জানান, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে নির্বাচন প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, তাতে বার্লিন আস্থাশীল।
তার ভাষায়, ২০২৬ সালে বিশ্বের অন্যতম বড় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। আমরা চাই, এটি যেন নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হয়।
আলোচনায় রুডিগার লোটজ আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জার্মানি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের পাশে থাকবে। মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কূটনৈতিক চাপ দুই দিক থেকেই সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন-প্রক্রিয়ায় ভুয়া তথ্য ও অসম্পূর্ণ নথিপত্র সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মন্তব্য করেন তিনি। যারা সঠিকভাবে আবেদন করেন, তাদের জন্য ভিসা পাওয়া কঠিন নয়। কিন্তু ভুল বা অসম্পূর্ণ নথি জমা দিলে ভিসা প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
জুলাই অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত রায় প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য না করলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত ১৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করে শেখ হাসিনাকে পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড ও দুটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করে। এই ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার।
একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর রাজসাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে শেখ হাসিনা ও কামালের দেশে থাকা সব স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ডিক্যাব আলোচনায় রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে জার্মানির অবস্থান মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনকে কেন্দ্র করে কোনো নির্দিষ্ট রায়ের প্রতি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী অবস্থান বজায় রেখে তিনি একইসঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, নির্বাচন এবং মানবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও জার্মানির ধারাবাহিক সমর্থনের বার্তা দিয়েছেন।
