বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। চাঁদপুর-১ আসন থেকে নির্বাচিত সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবার পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। এই রাজনীতিবিদ শুধু মন্ত্রী হতে চাননি—তিনি শিক্ষামন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। এই পার্থক্যই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে এবং শিক্ষা খাতে প্রত্যাশার মাত্রা বাড়িয়েছে।
স্বপ্নের সূচনা:
২০০১–২০০৬ সালে প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে ড. মিলন ‘হেলিকপ্টার মিলন’ নামে খ্যাতি পেয়েছিলেন। নিজ অর্থে হেলিকপ্টার ভাড়া করে পরীক্ষা কেন্দ্রে হানা দিয়ে নকল ধরার ঘটনা তখন দেশজুড়ে আলোচিত হয়। ফলে পাশের হার হঠাৎ কমে যায়, তবে নকলমুক্ত পরীক্ষার সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি হয়। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করেও তিনি স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
সম্প্রতি দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন—শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও বিশ্বমানের করতে সমন্বিত সংস্কার আনা হবে। কারিকুলাম পর্যালোচনা, ডিজিটাল লিটারেসি, ইংরেজি দক্ষতা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী ন্যানো টেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির কথা তিনি বলেছেন। তাঁর ভাষায়, “ব্যাকডেটেড শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এগোনো যাবে না।”
বাস্তবতার কাঠামো:
শিক্ষা কি কেবল পরীক্ষায় নকল বন্ধ করার বিষয়, নাকি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান কারখানা—এই মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। যখন হাজার হাজার মেধাবী তরুণ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার বদলে রুটিন আর কাগজে বন্দী হয়ে পড়ছে, তখন শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক দায়িত্ব। ড. মিলনের শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি এবং দীর্ঘদিনের আগ্রহ তাঁকে এই দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করেছে। সরকার তাঁর সেই যোগ্যতার মূল্যায়ন করেই দায়িত্ব দিয়েছে—যা প্রশংসনীয়। তবে প্রত্যাশা পূরণে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানো জরুরি।
শিক্ষকতা পেশার সংকট:
দীর্ঘদিন শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা না বাড়ায় শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আগমন কমেছে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন পিএইচডিধারী সহকারী অধ্যাপক যেখানে ৪০–৫০ হাজার টাকা বেতন পান, সেখানে ভারতে একজন পোস্ট-ডক গবেষক পান এক লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি। এই ব্যবধান রেখে শুধু আবেগী বক্তব্য দিয়ে ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেইন’ সম্ভব নয়।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: উপেক্ষিত বাস্তবতা
বাংলাদেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। এসব প্রতিষ্ঠানই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রধান ‘ফিডার’ হিসেবে কাজ করে। অথচ বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা অত্যন্ত অপ্রতুল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে বাড়িভাড়া ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হলেও তা তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়।
এই খাতের শিক্ষকদের জীবনমানের উন্নয়ন ছাড়া উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে সরকারি স্কুল-কলেজের সঙ্গে বিদ্যমান বৈষম্য কমিয়ে আনার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া অপরিহার্য।
এ ছাড়া বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের জন্য সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করে নিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতির ব্যবস্থা করাও জরুরি। সরকারি কলেজের মতো সুসংগঠিত পদোন্নতি কাঠামো না থাকলে দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
রিভার্স ব্রেন ড্রেইন: স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা
মন্ত্রী সম্প্রতি ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেইন’-এর কথা বলেছেন। ধারণাটি সময়োপযোগী ও সাহসী। কিন্তু যারা দেশে ফেরেন না, তাদের শুধু দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। দেশে ফিরে যোগ্যতানুযায়ী চাকরি না পাওয়া, কম বেতন এবং সম্মানজনক পরিবেশের অভাব—এসব বাস্তব কারণেই তারা ফেরেন না। প্রয়োজনে চীনের ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ প্রকল্পের মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
স্বপ্ন ও বাস্তবতার ফারাক কমাতে করণীয় :
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে কাজের পরিধি বিশাল। এখানে আবেগ নয়, প্রয়োজন দূরদর্শী নীতি, বিশেষজ্ঞভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সাহসী বিনিয়োগ।
১. শিক্ষাক্রম পুনর্গঠন: মুখস্থনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে সমস্যা সমাধানমূলক, সৃজনশীল ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও ডাটা সায়েন্স অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
২. শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি: শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা বাড়িয়ে মেধাবীদের এই পেশায় ফেরাতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের বেতন কাঠামো প্রণয়ন জরুরি।
৩. গবেষণায় বিনিয়োগ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। বিদেশি গবেষক আকর্ষণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য ন্যায্য বেতন: দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা বৃদ্ধির বাস্তব দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
৫. বাজেট বরাদ্দ: শিক্ষায় জিডিপি’র ৫ শতাংশ সরকার প্রধান কর্তৃক বরাদ্দের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
পরিশেষে, নতুন শিক্ষামন্ত্রীর সামনে সুযোগ এসেছে ইতিহাসে নিজের নাম লেখানোর—প্রশাসক হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারক হিসেবে। তিনি তাঁর সহযাত্রী হিসেবে পেয়েছেন শিক্ষকতায় অভিজ্ঞ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষা উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যোগ্য প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উপলব্ধি করেছেন—উন্নতমানের শিক্ষা ছাড়া একটি জাতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে তিনি উন্নত দেশের আদলে গড়ে তুলতে চান। এজন্যই নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, যা ইতিমধ্যে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই নতুন জুটির নেতৃত্ব শিক্ষাব্যবস্থায় কতটা গভীর কাঠামোগত সংস্কার আনতে পারে এবং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সফল হলে সেটিই হবে বাংলাদেশের শিক্ষাখাতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। শিক্ষক সমাজ ও জাতি তাকিয়ে আছে—এই অভিজ্ঞ নেতৃত্ব কতটা সাহসী ও দূরদর্শী সংস্কার আনতে পারে।
লেখক:
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর
