ঢাকাবুধবার , ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  1. অর্থনীতি
  2. আইন
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলাধুলা
  5. জাতীয়
  6. টপ নিউজ
  7. ধর্ম
  8. ফিচার
  9. বিনোদন
  10. রাজনীতি
  11. লাইফস্টাইল
  12. লিড নিউজ
  13. শিক্ষাঙ্গন
  14. সম্পাদকীয়
  15. সারাদেশ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিক্ষাখাতের কালো অধ্যায় : শিক্ষক নিয়োগের ত্রুটিপূর্ন প্রক্রিয়া

Doinik Kumar
ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬ ১:১৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মো. মাহবুবুর রহমান

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ড. এহসানুল হক মিলনের সঙ্গে শিক্ষক নেতাদের একটি বৈঠকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে। ভিডিওটি দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। কারণ এতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক গভীর ক্ষতের চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে অনেক শিক্ষকই প্রশ্নের মর্মবোধ বুঝতে অক্ষম। এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করা নয়; বরং শিক্ষক নিয়োগের ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে চিহ্নিত করে শিক্ষার মূল সংকট উন্মোচন করা।
আশি-নব্বইয়ের দশকের ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ ব্যবস্থা: আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত শিক্ষকতা ছিল অনেকের জন্য শেষ আশ্রয়স্থল। পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা অন্য কোনো চাকরি না পেয়ে স্থানীয় প্রভাব, টাকা বা আত্মীয়তার জোরে বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষক হিসেবে ঢুকে পড়তেন। ফলে শিক্ষকতা ধীরে ধীরে মেধাবীদের প্রথম পছন্দ না হয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য সহজলভ্য বিকল্পে পরিণত হয়—যা শিক্ষার মানকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

পরবর্তী সময়ে শুরু হয় প্রাইভেট টিউশনের বাণিজ্য। গণিত, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা বা ইংরেজির মতো কঠিন বিষয়ের শিক্ষকরা তো বটেই, যাঁরা ইংরেজিতে দক্ষ ছিলেন না, তাঁরাও বাড়তি উপার্জনের জন্য ইংরেজি পড়াতেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে দুর্বল থাকায় তাদের সেই দুর্বলতাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছিল নির্ভরশীলতার এক অন্ধকার বাজার। এটি ছিল এক ধরনের অনৈতিক অনুশীলন, যা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়।

অনেক শিক্ষক জীবিকার তাগিদে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কোচিং সেন্টার খোলা কিংবা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তেন। কলেজ শিক্ষকদের কেউ কেউ দূরের কোনো কলেজে নামেমাত্র যেতেন; সময়ের পরিক্রমায় এলাকায় নানা উপায়ে প্রভাব বিস্তার করতেন। অবশেষে তাঁদের কেউ কেউ কলেজ সরকারিকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারি কলেজ থেকেই অবসর গ্রহণ করেছেন। অনেকের শিক্ষা জীবনে পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ বা প্রথম শ্রেণি অর্জন সম্ভব হয়নি, অথচ নেটওয়ার্কের জোরে তাঁরা প্রভাষক থেকে অধ্যাপক হয়েছেন।
সহজভাবে বলতে গেলে, ৮০ ও ৯০ দশকে দেশের বহু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিবারের তুলনামূলকভাবে দুর্বল মেধার সন্তানটিই শিক্ষক হয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠান প্রধানের মন যুগিয়ে চলেছেন এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। আর তুলনামূলক মেধাবীরা কোণঠাসা হয়ে নীরবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
গ্রামীণ বাংলাদেশের নীরব সত্য: গ্রামের কোনো ছেলে পড়াশোনায় খারাপ করলে বাড়িতে বসে থাকত; বাবা-মা হতাশ হতেন। তখনই স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা স্কুল-কলেজ খুলে প্রস্তাব দিতেন— ‘তোমার পোলারে শিক্ষক বানাইয়া দিমু, কয়েক লাখ টাকা দাও।’ বাবা-মা টাকা জোগাড় করতেন, আর বাড়ির সেই পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া ছেলেটি হয়ে যেত শিক্ষক। এটি ছিল এক সময়ের শিক্ষক নিয়োগের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য।
মাদ্রাসা শিক্ষার সংকটপূর্ণ চিত্র: সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষার চিত্র ছিল আরও সংকটপূর্ণ। গ্রামের পড়াশোনায় সবচেয়ে দুর্বল ছেলেকে কম খরচ ও সহজ শর্তের কারণে মাদ্রাসায় পাঠানো হতো। সাধারণ শিক্ষায় ভালো না করতে পেরে অনেকে মাদ্রাসা থেকে পাস করতেন; সেই দুর্বল ছাত্রটিই পরে মাদ্রাসার শিক্ষকে পরিণত হতো। যাঁরা সাধারণ শিক্ষায় অযোগ্য প্রমাণিত হয়েছিলেন, তাঁরাই মাদ্রাসা খুলে আত্মীয়-স্বজনদের নিয়োগ দিতেন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাঁদের প্রস্তুতি ছিল প্রায় শূন্য। অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগের এই ত্রুটিপূর্ণ ধারা মাদ্রাসা শিক্ষাকেও গ্রাস করেছিল—যা আজও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্তমানে অনেক মাদ্রাসা আধুনিকায়নের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।

পারিবারিক ও রাজনৈতিক বাণিজ্য:
প্রভাবশালীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে নিজেদের পরিবার ও আত্মীয়দের চাকরির ব্যবস্থা করতেন। বাইরের লোকদের কাছ থেকেও টাকা নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হতো। প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবেও নিজেদের মধ্য থেকেই লোক বসানো হতো; পরিচালনা পর্ষদ থাকত নিজেদের দখলে। ফলে প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে গোষ্ঠীস্বার্থের হাতিয়ার, আর শিক্ষার মান থাকত উপেক্ষিত।

এছাড়া প্রভাবশালী পরিবারের গৃহবধূরাও সামাজিক পরিচিতি লাভের উদ্দেশ্যে স্কুল-কলেজের চাকরি গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি, লেখাপড়ায় দুর্বল মেয়েকে ভালো পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্যও অনেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়ে দিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এই সুযোগে স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনকে চাকরিতে ঢুকিয়েছেন। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে মূলত ‘কোয়ালিটি টাইম পাস’ করতেন; অনেকে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন না। প্রতিষ্ঠান প্রধানও কিছু বলতে পারতেন না। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান মূলত প্রতিষ্ঠান প্রধানের ওপর নির্ভরশীল, এবং তার হাজারো প্রমাণ আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, অনেকে জাল সনদ দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। ইতোমধ্যে ডিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদনে অনেকেই ধরা পড়েছেন; কারও কারও চাকরি গেছে, আবার কেউ কেউ এখনো বহাল তবিয়তে আছেন।

নিয়োগব্যবস্থার বিবর্তন এবং এখনও বাকি সংকট: নিবন্ধন পরীক্ষা চালুর আগে নিয়োগ হতো অধিকাংশ ক্ষেত্রে টাকা, আত্মীয়তা ও প্রভাবের ভিত্তিতে। ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের আমলে শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক ও প্রতিমন্ত্রী ড. এহসানুল হক মিলনের নেতৃত্বে প্রথম নিবন্ধন পরীক্ষা চালু হয়। এটি ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পরে এনটিআরসি গঠনের মাধ্যমে প্রক্রিয়া আরও সুসংহত হয়।

কিন্তু প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা পরিচালনা কমিটির হাতে থাকায় অযোগ্য ব্যক্তিরাই নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগেও এনটিআরসির মাধ্যমে ব্যবস্থা চালু হয়েছে—যা অত্যন্ত ইতিবাচক। অথচ কিছু শিক্ষক সংগঠন এর বিরোধিতা করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুপারিশ করছে।

ইংরেজি দুর্বলতার ঐতিহাসিক মূল:
এরশাদ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে বাধ্যতামূলক ইংরেজি বিষয়ে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা তুলে দেওয়া হয়। ফলে ইংরেজি ছাড়াই সহজে ডিগ্রি পাসের সংখ্যা বেড়ে যায়। তারাই পরে বেসরকারি স্কুলে শিক্ষক হয়ে ইংরেজি পড়াতে শুরু করেন। এর ফল হয়—পুরো এক প্রজন্ম ইংরেজিতে দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বিষয়ভিত্তিক নিয়োগ চালু হওয়ায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে, কিন্তু ক্ষত পূরণে এখনও সময় লাগবে।

মন্ত্রীর প্রশ্ন ও নেতাদের নীরবতা: ভিডিওতে দেখা যায় মন্ত্রী সহজ অথচ তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করেছেন—’আপনারা নিজেদের সুবিধার জন্য এত দাবি করছেন, ঠিক আছে মেনে নিলাম। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আপনারা কী করবেন?’ উত্তরে শিক্ষক নেতারা প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তাদের বয়স ও বক্তব্য শুনে মনে হয়, অনেকেই সেই পুরোনো ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক হয়েছেন। তাই শিক্ষার আমূল সংস্কারের কোনো মহৎ স্বপ্ন দেখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

মূল সংকট: যোগ্যতার বদলে প্রভাব
আর্থিক সংকটের চেয়েও ভয়ংকর হলো শিক্ষকদের মানসিক ও পেশাগত দুর্বলতা। যাঁরা টাকা, প্রভাব, আত্মীয়তা কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় যোগ্যতা ছাড়াই শিক্ষক হয়েছেন, তাদের কাছ থেকে জাতির ভবিষ্যতের জন্য মহৎ পরিকল্পনা আশা করা যায় না। শিক্ষকতাকে অনেকে শুধু সামাজিক স্বীকৃতি বা সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করেন। বেতনের অপ্রতুলতায় অনেকে ইন্স্যুরেন্স, কাজিগিরি, সাংবাদিকতা, মসজিদের ইমামতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ফলে শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা হয়, শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষার মান পড়ে যায়। শিক্ষকদের দায় যেমন আছে, তেমনি রাষ্ট্রেরও দায় আছে—কম বেতন, রাজনৈতিক চাপ ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে।

তবে আশার কথা, এভাবে নিয়োগ পাওয়া অনেকেই ইতোমধ্যে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। আর কিছু কিছু বাকি আছেন, যারা আগামী পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যেই অবসরে যাবেন। এতে ধীরে ধীরে এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার চাপ অনেকটাই কমবে।

উত্তরণের পথ: শিক্ষাখাতকে এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণে এখনই সময়—
· বর্তমান শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করা;
· কেন্দ্রীয় মেধাভিত্তিক পরীক্ষা আয়োজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ করা;
· ডিজিটাল মনিটরিং নিশ্চিত করা;
· প্রতিযোগিতামূলক পদোন্নতি প্রবর্তন করা;
· সম্মানজনক বেতন কাঠামো প্রবর্তন করা, যাতে দেশের সেরা মেধাবীরা শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন;
· প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগে মেধা ও সততাকে একমাত্র মাপকাঠি করা;
· ভবিষ্যতের শিক্ষকদের নিয়োগে কঠোর মেধাভিত্তিক পরীক্ষা অটুট রাখা;
· মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য আলাদা ও কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা।

শিক্ষামন্ত্রীর সেই প্রশ্ন এখনও বাতাসে ভাসছে—শিক্ষক নেতারা নিজেদের সুবিধার কথা বলেন, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার জন্য তারা কী করবেন?

এ দায় শুধু তাদের নয়; দায় আমাদের সবার, যে ব্যবস্থায় আমরা মেধাকে অবহেলা করে প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই সময়—শিক্ষক নিয়োগের ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়াকে চিরতরে বিদায় জানানোর। নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক ধারায় অটুট রাখা যায়, তবে ভবিষ্যতে শিক্ষক নিয়োগের এই অনৈতিক ও ত্রুটিপূর্ণ ধারা থেকে দেশ ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে পারবে। এখানেই আমাদের দায়িত্ব—সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং শিক্ষাকে গোষ্ঠীস্বার্থের হাত থেকে মুক্ত করা।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর
ইমেইল: mmrrajbari71@gmail.com

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।