মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। বৈশ্বিক এই সংকটের ঢেউ পৌঁছেছে বাংলাদেশের উপকূলেও। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পরও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় স্বস্তির খবর। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক অফিস আদেশে জানানো হয়েছে যে, এপ্রিল মাসেও ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়ছে না। টানা দ্বিতীয় মাসের মতো দাম অপরিবর্তিত রাখার এই সিদ্ধান্ত সরকারের একটি সাহসী ও জনবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে।
২০২৪ সালের শুরু থেকে সরকার বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বা ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ চালু করেছে। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানিমূল্য বিবেচনায় নিয়ে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করার কথা। সেই গাণিতিক সূত্র অনুযায়ী, এপ্রিলে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির ব্যাপক আশঙ্কা ছিল। বর্তমানে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু) জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম গত এক মাসে প্রায় ৯৮ শতাংশ বেড়েছে এবং প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে বর্তমানে খরচ হচ্ছে ১৯৮ টাকা। এমনকি ১২০ টাকায় বিক্রি হওয়া অকটেনের পেছনে সরকারের প্রকৃত খরচ পড়ছে ১৫০ টাকারও বেশি।
এই বিশাল ব্যবধানের অর্থ হলো, সরকার জনগণের ওপর বাড়তি খরচের অসহনীয় বোঝা না চাপিয়ে বিশাল অংকের ভর্তুকি নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে। বিপিসি-র সূত্র মতে, আমদানিমূল্যের সঙ্গে দামের সমন্বয় না করায় কেবল এই এক মাসেই সরকারকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির এই সংকটকালে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর এত বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির চাপ দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটিও আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রত্যক্ষ ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবহন খাত এবং কৃষি উৎপাদনে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন ও সেচ খরচ তাৎক্ষণিকভাবে বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল-ডালসহ সবজির দামকে আকাশচুম্বী করে তোলে। সরকার সম্ভবত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দেশের সামষ্টিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই মুহূর্তে এই ঝুঁকি গ্রহণ করেছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, সরকার যে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখল, তার সুফল কি সাধারণ মানুষ পূর্ণাঙ্গভাবে পাবে? বাজারব্যবস্থার ইতিহাস বলে, তেলের দাম কমলে বা স্থিতিশীল থাকলে পরিবহন ভাড়া বা পণ্যের দাম কমে না, কিন্তু বাড়লে তা মুহূর্তেই বেড়ে যায়। তাই এই পর্যায়ে প্রশাসনের কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা জরুরি। তেলের দাম বাড়েনি—এই অজুহাতে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী চক্র যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে।
পরিশেষে, বৈশ্বিক এই অস্থির সময়ে সরকারের এই অবস্থান প্রশংসার দাবিদার। তবে দীর্ঘমেয়াদে কেবল ভর্তুকি দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। আমাদের দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার পথে হাঁটতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি কতদিন স্থায়ী হয় সেটিই এখন দেখার বিষয়, তবে আপাতত এপ্রিল মাসের এই স্থিতাবস্থা জনজীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে আসবে।
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
